ইমরান চৌধুরী

প্রকাশিত :  ০১:২৭, ১৫ এপ্রিল ২০২১
সর্বশেষ আপডেট: ০৩:৩১, ১৫ এপ্রিল ২০২১

ইমরান চৌধুরী

ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর এবং স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন

ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর এবং স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন

ও হে নবীন - ও হে তরুণ - বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম লহ মোর শুভেচ্ছা বাংলাদেশের এই সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের মহাসমারোহে । আজকের তরুণ, তরুণী  যুবক, যুবতী এবং স্বাধীনতা উত্তরকালে জন্মগ্রহণকারী সকলকে জানাতে চাই আমার অনুধাবিত এবং আমার দেখা শুভক্ষণ ও দুঃসময়ের উপাখ্যান।

আমি ১৯৭১ সালের এক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, আমি এক ১৭ বছর বয়সী  শহীদ মুক্তিযোদ্ধার অনুজ এবং আমি  এক ১১ বছর বয়সী শরণার্থী ( রিফুজি) বালক। স্বাধীনতা যুদ্ধ যারা স্বচক্ষে অবলোকন করে নাই তাদের কাছে স্বাধীনতা যুদ্ধের বর্বরতা, স্বাধীনতা যুদ্ধের ভয়াবহতা, স্বাধীনতা যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার অসহায়ত্ব, গৃহহীনতা, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার জীবন হারানোর ভয়, মুক্তিযোদ্ধা পিতার জীবন যে কোন সময় হারানোর দুঃস্বপ্ন, বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পরে যাওয়ার সদা সর্বদা ভীতসন্ত্রস্ত থাকা, অনাহারে দিনের পর দিন কাটানোর কথা বলা এবং সেই সময়কার চিত্র অঙ্কন করা সত্যিই একটা অসাধ্য ব্যাপার ।আমি চাই না আমার সবচে’ বড় শত্রুও কোনদিন এমন ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হোক।

স্বাধীনতা যুদ্ধ সেদিন হয়েছিল বলেই আজ আমরা পৃথিবীর সকল মানুষের কাছে বাংলাদেশি বা বাঙ্গালী হিসেবে পরিচিত - একবার শুধু ভেবে দেখুন সেদিন যদি আমার বা আপনার পূর্ব পুরুষরা ঐ স্বৈরাচারী, বর্বর, পাষন্ড, পাঞ্জাবি মুসলিম পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়ে নিজেদের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ না করতো  তাহলে আজ আমরা  কোন পরিচয়ে পরিচিত হতাম সারা পৃথিবীর কাছে? এক পরিচয়বিহীন, অস্বীকৃত, ঔপনিবেশিক, বিদেশী, আগ্রাসী, খুনি, নারীর ইজ্জত লুটকারি এবং বর্ণ বৈষম্যপূর্ণ একদল পিশাচের সংস্পর্শের পরিচয়ে পরিচিত হতে হত আমাদেরকেও আজও। আপনারা অতীব ভাগ্যবান কারণ আপনাদের পূর্বপুরুষরা ছিল এক অপরিসীম সাহসী বাংলা মায়ের দামাল ছেলে ওরা - ওঁরা যদি সেদিন ঝাঁপিয়ে না পরত, ঐ পৈশাচিক, লুটেরা, আমাদের মা ও বোনদের সম্ভ্রম - ইজ্জত লুণ্ঠনকারীদের হাত থেকে বাংলাকে না বাঁচাতো তাহলে আজ আমাদের ইতিহাস লেখা হত হয়ত  অন্যভাবে।

তাই, বারবার ফিরে যাই সেই সোনালী অতীতের স্মৃতিগুলোকে মনের সেলুলয়েডের ফ্রেমে অবলোকন করতে আর পুনরুজ্জীবিত হতে চাই নতুন উদ্দীপনায় আজকের প্রজন্মকে জানাতে - কি হয়েছিলো? সেই কালো অমাবস্যার ১৯৭১ সালে। কিভাবে ঐ পিশাচ গুলো নিগৃহীত করেছিল বাংলার সাত কোটি মানুষকে - ওদের কাছে ছিলনা আমাদের  জন্য কোন সম্মান, না ছিল কোন তোয়াক্কা আমাদের ধর্মের, ওরা জানতে চায়নি আমরা কারা - আমরা সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীরা সবাই ছিলাম ওদের হত্যাযজ্ঞের বলির পাঠা, ওদের রক্তপিপাসার পানীয়, ওদের যৌন উন্মাদনার পাশবিক অত্যাচারের এক শাবক, ওরা নয় মাস যাবত চালিয়েছিল আমাদের উপর পৃথিবীর ইতিহাসের জঘন্যতম জেনোসাইড, যা কিনা হিটলারের ইহুদি ফাইনাল সল্যুশন থেকেও জঘন্য এবং ঐ পৈশাচিক পাকিস্তানি বর্বর আর্মিও আমাদেরকে বাংলার মাটি থেকে চিরতরে উৎপাটন করার প্রয়াস চালিয়েছিলো। ওরা চেয়েছিল আমাদের সবাইকে হত্যা করে - উৎপাটন করে ওরা বাংলায় পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিহারি, কাশ্মীরি, মুহাজিরদের (করাচী)  দিয়ে নতুন বসতি গড়ে তুলতে যাতে করে কেউ আর  কোনদিন স্বাধিকার, ভাষা, গণতন্ত্র, সমান অধিকার না চাইতে পারে। এই অভিপ্রায়েই ওরা চেয়েছিল বাঙ্গালীদেরকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে।


বাংলার ৪ হাজার বছরের ইতিহাসে সবচে বড় ক্রান্তিকাল, সবচে বড় বিপদ, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আগ্রাসনের কালো থাবা নেমে এসেছিল একাত্তরের ২৫ মার্চের গভীর রাত থেকে পরবর্তী দিনগুলোতে। সেই দিন - লক্ষ কোটি মানুষের আহাজারি, কিংকর্তব্যবিমূর, ভীতি, গৃহহীনতা, আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে যাওয়া বাড়ি ঘর, গুদাম, মিল কারখানা, নিজের দেশের বোমারু বিমান দিয়ে আঘাত হেনে উড়িয়ে দেয়া সব অবকাঠামো, প্রাণ নিয়ে পলায়নরত নিরস্ত্র মানুষের ওপর বিমান থেকে গুলি করে হত্যার উৎসব, মায়ের আর্তনাদ, শিশুদের কান্না, বাবার অসহায়ত্ব সব মিলিয়ে সে যে কি এক বিভীষিকাময় সময় শুরু হল সেই কালো রাত ২৫ সে মার্চ থেকে তা প্রকাশ করার মত কোন ভাষা আমার অভিধানে নেই ।

হাস্যকর হলেও সত্যি যে, ঐ সময়ে মধ্যপ্রাচ্য, নিকট প্রাচ্য, দূরপ্রাচ্য, উত্তর ও দক্ষিণ ও পশ্চিম এর সব দেশ এর  সবাই ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে তাকিয়ে ছিল অন্যদিকে। আবার কেউ কেউ ঐ পিশাচদের বাহবা এবং খোলাখুলি ও গোপনে অস্ত্র, বারুদ, গোলা, গুলি বানানোর ফ্যাক্টরি দিয়ে সাহায্যও করেছিল,  যুদ্ধ জাহাজ দিয়ে ভয় দেখাতেও পিছপা হয় নাই । আজ যদিও অনেকেই নতুন প্রজন্মকে মস্তিষ্ক ভ্রম  করতে যেয়ে কুম্ভীরাশ্রু ফেলে - নতুন গল্পজাল বিস্তার করতে। আর ছিল আরও এক দল যারা ছিল পঞ্চম বাহিনী - হাত মিলিয়েছিল আমাদের চিরশত্রুর সাথে - যারা হাত মিলিয়েছিল ঐ নরপিশাচদের সাথে হত্যাযজ্ঞের সাহায্যকারী হিসেবে, নারী ধর্ষণ করার সহায়তাকারি হয়ে, হত্যাকারীদের চোখ এবং কান হিসেবে গুপ্তচর হিসেবে নিজের মা, বোন ভাই এবং জন্মগ্রহণকারী মাটির সাথে করেছিল জঘন্যতম বিশ্বাসঘাতকতা - মুক্তিসেনাদের ধরিয়ে দিতে করেছিল ওরা সাহায্য ঐ বিশ্বাসঘাতক নরপিশাচ গোষ্ঠী ।

বাংলার আকাশের ঐ অমনিশা লগ্নে সাধারণ মানুষ জীবন বাঁচাতে, মা ও বোনদের সম্ভ্রম রক্ষা করতে, ছেলেমেয়েদের জীবন বাঁচাতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী দেশে - যে দেশের সাথে গাঁথা এবং সম্পৃক্ত আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ইতিহাস, আমাদের শিকড়, আমাদের সামাজিকতা,  আমাদের ভাগাভাগি করা ঐতিহ্য সেই ইন্ডিয়াতে। যখন ঐ পিশাচ বর্বর পাকিস্তানি মুসলিম আর্মি - আমাদেরকে মুসলিম  হিসেবে স্বীকৃতি দিতেও ছিল ওরা নিমরাজি, কলেমা পড়লেও ওরা বিশ্বাস করতো না আমরা আসলেই মসুলমান কিনা! কারন ওদেরকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আনা হয়েছিলো পূর্ব পাকিস্তানে ওমুসলিম বাঙ্গালীদের সাথে জেহাদ করার জন্য - তাই ওরা আমাদের ধর্মবিশ্বাসে ওদের আস্থা ছিল না এবং অবস্থাদৃষ্টে এটাও প্রতীয়মান হয় যে, পশ্চিমের মুসলমানরা ঐ আমলে তাদের থেকে পূর্বে অবস্থিত মুসলমান জনগোষ্ঠীকে একটু নিচু চোখে দেখতো। তাই, ইসলাম ধর্মের প্রতি আমাদের আনগত্য, বিশ্বাসকে ওরা তাচ্ছিল্য করতো।

ঠিক একিভাবে এক বৃষ্টিভেজা কালো সন্ধ্যায় আমি আমার পরিবারসহ আশ্রয় নিলাম ইন্ডিয়াতে  -  ওঁরা আমাদেরকে জিজ্ঞেস করলো না আমরা কারা? কি আমাদের নাম, কি আমাদের ধর্ম। আমাদের আগে ওঁদের দেশে আশ্রয় নিয়েছিল আমাদের সৈনিক, আমাদের যুবক, আমাদের নেতারা। ওঁদের দেশের মাটি থেকে ওঁদের সাহায্য - ওঁদের প্রশিক্ষণ, ওঁদের হাতিয়ার, ওঁদের গোলা বারুদ, ওঁদের দেওয়া আহার, কাপড়, জুতা, তাঁবু, গ্রেনেড, মাইন দিয়ে বাংলাকে শত্রু মুক্ত করে স্বাধীন করার লড়াইয়ে এক দুঃসাধ্য অভিযানে নেমেছিলো বাংলার দামাল ছেলেরা।
আমরা শরণার্থী - আমাদের জন্য বানালো ওরা রিফুজি ক্যাম্প, আমাদের জন্য রাতারাতি ব্যবস্থা করলো রেশন, চাল, ডাল, আটা, তেল, চিকিৎসা, বাস, ট্রেন সব বিনামূল্যে। এক থেকে দুই কোটি বাঙ্গালী পূর্ব পাকিস্তান থেকে জীবন বাঁচাতে শরণার্থী  হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল ভারতে । নয় নয়টি মাস শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছিল ইন্ডিয়া - আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সব ধরনের সাহায্য করার পাশাপাশি ইন্ডিয়ান সেনাবাহিনী আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাধ মিলিয়ে যুদ্ধ করে ৯ মাসের দেশটাকে স্বাধীন করে দিয়েছিল।  এ ঋণ মানবতার, এ ঋণ মহানুভতার, এ  ঋণ আমাদের দেশের জন্য ওঁদের দেশের সেনাদের জীবন দানের ঋণ ।

আজ সেই দুঃসময়ের বন্ধু দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন আমাদের দেশে আসে সেই সোনালি অতীতের শুভক্ষণ উদযাপনের জন্য তখনই দেখতে পাওয়া সেই পুরানো শত্রু আবার ভন্ডুল করতে চায় তাঁর শুভ আগমন। যখন পশ্চিম পাকিস্তানিরা বেশুমারে পূর্ব পাকিস্তানি মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করলো সেটা নিয়ে তারা পাকিস্তানকে  কিছু বলে না। আমার ১৭ বছর বয়স্ক মুসলিম মুক্তিযোদ্ধা ভাইকে সদলবলে যখন পাকিস্তানি আর্মি আটক করলো এবং ১১ দিন নির্মমভাবে অত্যাচার করলো -  যা কিনা জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী নিষিদ্ধ এবং দুঃখজনক হলেও সত্য যে ঐ পিশাচ পাকিস্তানি মুসলিম আর্মি আমার কিশোর ভাইটিকে ১৯৭১ সালের  ২১ শে  নভেম্বর তারিখে ঈদ উল ফিতর দিন রাত্রে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করলো - এটার কোন প্রতিবাদ তারা করে নাই! করে না! এবং কখনো করবেও না!

পক্ষান্তরে, মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে আমাদের দেশের, আমাদের বাঙ্গালীদের সবচেয়ে দুঃসময়ের বন্ধু দেশের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে যে প্রলয় তারা চালানোর চেষ্টা করেছে তা’ কি বলার অপেক্ষা রাখে এরা কারা? কি তাদের বর্ণ পরিচয় ? কেন তাদের এত গাত্রদাহ? কেন তাদের ক্ষোব, কেন তাদের এত প্রতিহিংসা? কি প্রমাণ করতে চাইল তারা? তাদের অনিচ্ছাকৃতভাবে সৃষ্ট বাংলাদেশ তারা আজও মেনে নিতে পারে নাই। তারা বাংলাদেশকে  তালেবান জাতীয় একটা সন্ত্রাসী অকার্যকর, অরাজকতার রাজ্যে পর্যবসিত করতে চায়। তারা মানতে পারছে না তাদের পূর্বপুরুষদের সেই পরাজয় । তারা চায় বাংলাদেশকে দুর্ভিক্ষ, অনাহারের, সংকটময় জনপদ বানাতে - এবারের এই প্রলয়ঙ্কর তান্ডব কি তাই প্রমাণ করে না?

নতুন প্রজন্ম! আপনারাই উপলব্ধি করুন বুঝতে চেষ্টা করুন আসল সত্যটা কী? একটা কথা সবাই কে মনে রাখতে হবে - একদা যে বিশ্বাসঘাতক, সে সর্বদাই  বিশ্বাসঘাতক, একদা যে শত্রু, সে সর্বদাই শত্রু !

ইমরান চৌধুরী: লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কমিউনিটি একটিভিস্ট




Leave Your Comments


মতামত এর আরও খবর