ইমরান চৌধুরী

img

ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর এবং স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন

প্রকাশিত :  ০১:২৭, ১৫ এপ্রিল ২০২১
সর্বশেষ আপডেট: ০৩:৩১, ১৫ এপ্রিল ২০২১

ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর এবং স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন

ও হে নবীন - ও হে তরুণ - বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম লহ মোর শুভেচ্ছা বাংলাদেশের এই সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের মহাসমারোহে । আজকের তরুণ, তরুণী  যুবক, যুবতী এবং স্বাধীনতা উত্তরকালে জন্মগ্রহণকারী সকলকে জানাতে চাই আমার অনুধাবিত এবং আমার দেখা শুভক্ষণ ও দুঃসময়ের উপাখ্যান।

আমি ১৯৭১ সালের এক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, আমি এক ১৭ বছর বয়সী  শহীদ মুক্তিযোদ্ধার অনুজ এবং আমি  এক ১১ বছর বয়সী শরণার্থী ( রিফুজি) বালক। স্বাধীনতা যুদ্ধ যারা স্বচক্ষে অবলোকন করে নাই তাদের কাছে স্বাধীনতা যুদ্ধের বর্বরতা, স্বাধীনতা যুদ্ধের ভয়াবহতা, স্বাধীনতা যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার অসহায়ত্ব, গৃহহীনতা, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার জীবন হারানোর ভয়, মুক্তিযোদ্ধা পিতার জীবন যে কোন সময় হারানোর দুঃস্বপ্ন, বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পরে যাওয়ার সদা সর্বদা ভীতসন্ত্রস্ত থাকা, অনাহারে দিনের পর দিন কাটানোর কথা বলা এবং সেই সময়কার চিত্র অঙ্কন করা সত্যিই একটা অসাধ্য ব্যাপার ।আমি চাই না আমার সবচে’ বড় শত্রুও কোনদিন এমন ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হোক।

স্বাধীনতা যুদ্ধ সেদিন হয়েছিল বলেই আজ আমরা পৃথিবীর সকল মানুষের কাছে বাংলাদেশি বা বাঙ্গালী হিসেবে পরিচিত - একবার শুধু ভেবে দেখুন সেদিন যদি আমার বা আপনার পূর্ব পুরুষরা ঐ স্বৈরাচারী, বর্বর, পাষন্ড, পাঞ্জাবি মুসলিম পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়ে নিজেদের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ না করতো  তাহলে আজ আমরা  কোন পরিচয়ে পরিচিত হতাম সারা পৃথিবীর কাছে? এক পরিচয়বিহীন, অস্বীকৃত, ঔপনিবেশিক, বিদেশী, আগ্রাসী, খুনি, নারীর ইজ্জত লুটকারি এবং বর্ণ বৈষম্যপূর্ণ একদল পিশাচের সংস্পর্শের পরিচয়ে পরিচিত হতে হত আমাদেরকেও আজও। আপনারা অতীব ভাগ্যবান কারণ আপনাদের পূর্বপুরুষরা ছিল এক অপরিসীম সাহসী বাংলা মায়ের দামাল ছেলে ওরা - ওঁরা যদি সেদিন ঝাঁপিয়ে না পরত, ঐ পৈশাচিক, লুটেরা, আমাদের মা ও বোনদের সম্ভ্রম - ইজ্জত লুণ্ঠনকারীদের হাত থেকে বাংলাকে না বাঁচাতো তাহলে আজ আমাদের ইতিহাস লেখা হত হয়ত  অন্যভাবে।

তাই, বারবার ফিরে যাই সেই সোনালী অতীতের স্মৃতিগুলোকে মনের সেলুলয়েডের ফ্রেমে অবলোকন করতে আর পুনরুজ্জীবিত হতে চাই নতুন উদ্দীপনায় আজকের প্রজন্মকে জানাতে - কি হয়েছিলো? সেই কালো অমাবস্যার ১৯৭১ সালে। কিভাবে ঐ পিশাচ গুলো নিগৃহীত করেছিল বাংলার সাত কোটি মানুষকে - ওদের কাছে ছিলনা আমাদের  জন্য কোন সম্মান, না ছিল কোন তোয়াক্কা আমাদের ধর্মের, ওরা জানতে চায়নি আমরা কারা - আমরা সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীরা সবাই ছিলাম ওদের হত্যাযজ্ঞের বলির পাঠা, ওদের রক্তপিপাসার পানীয়, ওদের যৌন উন্মাদনার পাশবিক অত্যাচারের এক শাবক, ওরা নয় মাস যাবত চালিয়েছিল আমাদের উপর পৃথিবীর ইতিহাসের জঘন্যতম জেনোসাইড, যা কিনা হিটলারের ইহুদি ফাইনাল সল্যুশন থেকেও জঘন্য এবং ঐ পৈশাচিক পাকিস্তানি বর্বর আর্মিও আমাদেরকে বাংলার মাটি থেকে চিরতরে উৎপাটন করার প্রয়াস চালিয়েছিলো। ওরা চেয়েছিল আমাদের সবাইকে হত্যা করে - উৎপাটন করে ওরা বাংলায় পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিহারি, কাশ্মীরি, মুহাজিরদের (করাচী)  দিয়ে নতুন বসতি গড়ে তুলতে যাতে করে কেউ আর  কোনদিন স্বাধিকার, ভাষা, গণতন্ত্র, সমান অধিকার না চাইতে পারে। এই অভিপ্রায়েই ওরা চেয়েছিল বাঙ্গালীদেরকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে।


বাংলার ৪ হাজার বছরের ইতিহাসে সবচে বড় ক্রান্তিকাল, সবচে বড় বিপদ, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আগ্রাসনের কালো থাবা নেমে এসেছিল একাত্তরের ২৫ মার্চের গভীর রাত থেকে পরবর্তী দিনগুলোতে। সেই দিন - লক্ষ কোটি মানুষের আহাজারি, কিংকর্তব্যবিমূর, ভীতি, গৃহহীনতা, আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে যাওয়া বাড়ি ঘর, গুদাম, মিল কারখানা, নিজের দেশের বোমারু বিমান দিয়ে আঘাত হেনে উড়িয়ে দেয়া সব অবকাঠামো, প্রাণ নিয়ে পলায়নরত নিরস্ত্র মানুষের ওপর বিমান থেকে গুলি করে হত্যার উৎসব, মায়ের আর্তনাদ, শিশুদের কান্না, বাবার অসহায়ত্ব সব মিলিয়ে সে যে কি এক বিভীষিকাময় সময় শুরু হল সেই কালো রাত ২৫ সে মার্চ থেকে তা প্রকাশ করার মত কোন ভাষা আমার অভিধানে নেই ।

হাস্যকর হলেও সত্যি যে, ঐ সময়ে মধ্যপ্রাচ্য, নিকট প্রাচ্য, দূরপ্রাচ্য, উত্তর ও দক্ষিণ ও পশ্চিম এর সব দেশ এর  সবাই ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে তাকিয়ে ছিল অন্যদিকে। আবার কেউ কেউ ঐ পিশাচদের বাহবা এবং খোলাখুলি ও গোপনে অস্ত্র, বারুদ, গোলা, গুলি বানানোর ফ্যাক্টরি দিয়ে সাহায্যও করেছিল,  যুদ্ধ জাহাজ দিয়ে ভয় দেখাতেও পিছপা হয় নাই । আজ যদিও অনেকেই নতুন প্রজন্মকে মস্তিষ্ক ভ্রম  করতে যেয়ে কুম্ভীরাশ্রু ফেলে - নতুন গল্পজাল বিস্তার করতে। আর ছিল আরও এক দল যারা ছিল পঞ্চম বাহিনী - হাত মিলিয়েছিল আমাদের চিরশত্রুর সাথে - যারা হাত মিলিয়েছিল ঐ নরপিশাচদের সাথে হত্যাযজ্ঞের সাহায্যকারী হিসেবে, নারী ধর্ষণ করার সহায়তাকারি হয়ে, হত্যাকারীদের চোখ এবং কান হিসেবে গুপ্তচর হিসেবে নিজের মা, বোন ভাই এবং জন্মগ্রহণকারী মাটির সাথে করেছিল জঘন্যতম বিশ্বাসঘাতকতা - মুক্তিসেনাদের ধরিয়ে দিতে করেছিল ওরা সাহায্য ঐ বিশ্বাসঘাতক নরপিশাচ গোষ্ঠী ।

বাংলার আকাশের ঐ অমনিশা লগ্নে সাধারণ মানুষ জীবন বাঁচাতে, মা ও বোনদের সম্ভ্রম রক্ষা করতে, ছেলেমেয়েদের জীবন বাঁচাতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী দেশে - যে দেশের সাথে গাঁথা এবং সম্পৃক্ত আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ইতিহাস, আমাদের শিকড়, আমাদের সামাজিকতা,  আমাদের ভাগাভাগি করা ঐতিহ্য সেই ইন্ডিয়াতে। যখন ঐ পিশাচ বর্বর পাকিস্তানি মুসলিম আর্মি - আমাদেরকে মুসলিম  হিসেবে স্বীকৃতি দিতেও ছিল ওরা নিমরাজি, কলেমা পড়লেও ওরা বিশ্বাস করতো না আমরা আসলেই মসুলমান কিনা! কারন ওদেরকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আনা হয়েছিলো পূর্ব পাকিস্তানে ওমুসলিম বাঙ্গালীদের সাথে জেহাদ করার জন্য - তাই ওরা আমাদের ধর্মবিশ্বাসে ওদের আস্থা ছিল না এবং অবস্থাদৃষ্টে এটাও প্রতীয়মান হয় যে, পশ্চিমের মুসলমানরা ঐ আমলে তাদের থেকে পূর্বে অবস্থিত মুসলমান জনগোষ্ঠীকে একটু নিচু চোখে দেখতো। তাই, ইসলাম ধর্মের প্রতি আমাদের আনগত্য, বিশ্বাসকে ওরা তাচ্ছিল্য করতো।

ঠিক একিভাবে এক বৃষ্টিভেজা কালো সন্ধ্যায় আমি আমার পরিবারসহ আশ্রয় নিলাম ইন্ডিয়াতে  -  ওঁরা আমাদেরকে জিজ্ঞেস করলো না আমরা কারা? কি আমাদের নাম, কি আমাদের ধর্ম। আমাদের আগে ওঁদের দেশে আশ্রয় নিয়েছিল আমাদের সৈনিক, আমাদের যুবক, আমাদের নেতারা। ওঁদের দেশের মাটি থেকে ওঁদের সাহায্য - ওঁদের প্রশিক্ষণ, ওঁদের হাতিয়ার, ওঁদের গোলা বারুদ, ওঁদের দেওয়া আহার, কাপড়, জুতা, তাঁবু, গ্রেনেড, মাইন দিয়ে বাংলাকে শত্রু মুক্ত করে স্বাধীন করার লড়াইয়ে এক দুঃসাধ্য অভিযানে নেমেছিলো বাংলার দামাল ছেলেরা।
আমরা শরণার্থী - আমাদের জন্য বানালো ওরা রিফুজি ক্যাম্প, আমাদের জন্য রাতারাতি ব্যবস্থা করলো রেশন, চাল, ডাল, আটা, তেল, চিকিৎসা, বাস, ট্রেন সব বিনামূল্যে। এক থেকে দুই কোটি বাঙ্গালী পূর্ব পাকিস্তান থেকে জীবন বাঁচাতে শরণার্থী  হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল ভারতে । নয় নয়টি মাস শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছিল ইন্ডিয়া - আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সব ধরনের সাহায্য করার পাশাপাশি ইন্ডিয়ান সেনাবাহিনী আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাধ মিলিয়ে যুদ্ধ করে ৯ মাসের দেশটাকে স্বাধীন করে দিয়েছিল।  এ ঋণ মানবতার, এ ঋণ মহানুভতার, এ  ঋণ আমাদের দেশের জন্য ওঁদের দেশের সেনাদের জীবন দানের ঋণ ।

আজ সেই দুঃসময়ের বন্ধু দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন আমাদের দেশে আসে সেই সোনালি অতীতের শুভক্ষণ উদযাপনের জন্য তখনই দেখতে পাওয়া সেই পুরানো শত্রু আবার ভন্ডুল করতে চায় তাঁর শুভ আগমন। যখন পশ্চিম পাকিস্তানিরা বেশুমারে পূর্ব পাকিস্তানি মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করলো সেটা নিয়ে তারা পাকিস্তানকে  কিছু বলে না। আমার ১৭ বছর বয়স্ক মুসলিম মুক্তিযোদ্ধা ভাইকে সদলবলে যখন পাকিস্তানি আর্মি আটক করলো এবং ১১ দিন নির্মমভাবে অত্যাচার করলো -  যা কিনা জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী নিষিদ্ধ এবং দুঃখজনক হলেও সত্য যে ঐ পিশাচ পাকিস্তানি মুসলিম আর্মি আমার কিশোর ভাইটিকে ১৯৭১ সালের  ২১ শে  নভেম্বর তারিখে ঈদ উল ফিতর দিন রাত্রে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করলো - এটার কোন প্রতিবাদ তারা করে নাই! করে না! এবং কখনো করবেও না!

পক্ষান্তরে, মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে আমাদের দেশের, আমাদের বাঙ্গালীদের সবচেয়ে দুঃসময়ের বন্ধু দেশের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে যে প্রলয় তারা চালানোর চেষ্টা করেছে তা’ কি বলার অপেক্ষা রাখে এরা কারা? কি তাদের বর্ণ পরিচয় ? কেন তাদের এত গাত্রদাহ? কেন তাদের ক্ষোব, কেন তাদের এত প্রতিহিংসা? কি প্রমাণ করতে চাইল তারা? তাদের অনিচ্ছাকৃতভাবে সৃষ্ট বাংলাদেশ তারা আজও মেনে নিতে পারে নাই। তারা বাংলাদেশকে  তালেবান জাতীয় একটা সন্ত্রাসী অকার্যকর, অরাজকতার রাজ্যে পর্যবসিত করতে চায়। তারা মানতে পারছে না তাদের পূর্বপুরুষদের সেই পরাজয় । তারা চায় বাংলাদেশকে দুর্ভিক্ষ, অনাহারের, সংকটময় জনপদ বানাতে - এবারের এই প্রলয়ঙ্কর তান্ডব কি তাই প্রমাণ করে না?

নতুন প্রজন্ম! আপনারাই উপলব্ধি করুন বুঝতে চেষ্টা করুন আসল সত্যটা কী? একটা কথা সবাই কে মনে রাখতে হবে - একদা যে বিশ্বাসঘাতক, সে সর্বদাই  বিশ্বাসঘাতক, একদা যে শত্রু, সে সর্বদাই শত্রু !

ইমরান চৌধুরী: লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কমিউনিটি একটিভিস্ট

img

পুঁজিবাজারে বড় চমক কি সময়ের ব্যাপার মাত্র?

প্রকাশিত :  ১৬:৫২, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের এই সময়টি বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও যুদ্ধের মেঘ কাটিয়ে বিশ্ব আজ এক নতুন স্থিতিশীলতার সুপ্রভাতের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার পারদ নিম্নমুখী হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যের উল্লেখযোগ্য পতন বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এক বিশেষ স্বস্তির বার্তা বয়ে এনেছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত করতে একের পর এক তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজের আগমন এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহের শক্তিশালী অবস্থান আগামী রবিবারের পুঁজিবাজারে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই বিশ্লেষণটি মূলত বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও দেশীয় সামষ্টিক অর্থনীতির নিরিখে আমাদের পুঁজিবাজারের সম্ভাব্য গতিপথকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরিবর্তন ও তেলের মূল্যপ্রবণতা

বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত জ্বালানি তেলের বাজার গত কয়েক মাস ধরে যে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে এসে তা নাটকীয়ভাবে স্তিমিত হতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) দামে এখন নিম্নমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। সাম্প্রতিক লেনদেনগুলোতে দেখা গেছে, ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৯৭.৯৯ ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের সেশনের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ কম। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি ৯৫ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমার নিচেও অবস্থান করছে। জেপি মরগানের মতো বিশ্বখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বাভাস দিচ্ছে যে, ২০২৬ সাল জুড়ে তেলের গড় মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৬০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি চমৎকার সংকেত।

এই দরপতনের প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পাদিত দুই সপ্তাহের প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য একটি \'গেম চেঞ্জার\' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালী—যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী—পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীরা এখন তেলের বাজারদর থেকে \'যুদ্ধ ঝুঁকি প্রিমিয়াম\' বা \'ওয়ার প্রিমিয়াম\' সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন, যার ফলশ্রুতিতে দামের এই স্থিতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা: সংকট থেকে সম্ভাবনার দ্বারে

বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে আসার এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবস্থাপনায়ও এক অভাবনীয় গতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাতের দুশ্চিন্তা লাঘব করে একের পর এক জ্বালানি তেল ও এলএনজিবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর এবং মহেশখালী টার্মিনালে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এটি শুধুমাত্র কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং সরকারের সুপরিকল্পিত আমদানি কৌশলেরই অংশ।

৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মালয়েশিয়া থেকে আসা দুটি বৃহৎ মাদার ট্যাংকার \'সেন্ট্রাল স্টার\' এবং \'ইস্টার্ন কুইন্স\' চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করেছে। তারা মোট ৫১,০০০ মেট্রিক টন জ্বালানি (২৫,০০০ টন ফার্নেস অয়েল ও ২৬,০০০ টন অকটেন) বহন করে এনেছে। এছাড়া সিঙ্গাপুর থেকে আসা আরেকটি জাহাজ ২৭,০০০ টন ডিজেল খালাস করেছে। তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। ১৫ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়া থেকে ৬৪,৬৭৮ মেট্রিক টন এলএনজি নিয়ে \'মারান গ্যাস হাইড্রা\' মহেশখালীতে পৌঁছেছে এবং ১৮ এপ্রিল অ্যাঙ্গোলা থেকে আরও ৬৯,০১৫ মেট্রিক টন এলএনজি নিয়ে \'লোবিটো\' আসার কথা রয়েছে। মার্চ মাস থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৩টি জ্বালানিবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছেছে, যা দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য এক বিরাট স্বস্তি।

সামষ্টিক অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তি ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলো ২০২৬ সালের শুরুতেই ক্রমান্বয়ে উন্নতির শিখরে আরোহণ করছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা অর্থনীতির অন্তর্নিহিত শক্তিরই পরিচায়ক। ৭ এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪.৩৫ বিলিয়ন ডলারে। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন (এসিইউ) ও অন্যান্য বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের পরেও রিজার্ভের এই অবস্থান অত্যন্ত সন্তোষজনক।

রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রেও চলতি বছর নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। মার্চ মাসে প্রবাসীরা রেকর্ড ৩.৭৭৫ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, যা একক মাস হিসেবে এ যাবতকালের সর্বোচ্চ। এপ্রিলের প্রথমার্ধেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ১ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে ১,৭৮৮ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২১.৫ শতাংশ বেশি। এই শক্তিশালী রিজার্ভ ও রেকর্ড রেমিট্যান্সের ফলে ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়ে ৩.৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। একইসাথে খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি (যা সেপ্টেম্বর মাসে ছিল ১৪.২৪ শতাংশ) নাটকীয়ভাবে কমে ফেব্রুয়ারিতে ২.৩৯ শতাংশে নেমে আসায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও বাজার স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

পুঁজিবাজারের গতিপ্রকৃতি ও রবিবারের পূর্বাভাস

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বিগত কয়েক সপ্তাহের সংশোধন প্রক্রিয়ার পর এখন একটি শক্তিশালী ঘুরে দাঁড়ানোর (রিবাউন্ড) উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ডিএসই সূচক ৫,৬০০ পয়েন্টের ঘর স্পর্শ করার পর মুনাফা শিকারিদের চাপে কিছুটা কমলেও গড় দৈনিক লেনদেন ১,০০০ কোটি টাকার ওপরে থাকা নির্দেশ করে যে বাজারে পর্যাপ্ত তারল্য ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ রয়েছে।

আগামী রবিবার পুঁজিবাজার ইতিবাচক থাকার পেছনে তিনটি প্রধান প্রভাবক কাজ করবে বলে আমি মনে করি:

প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় তালিকাভুক্ত উৎপাদনশীল ও বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় কমে আসবে, যা সরাসরি তাদের কর্পোরেট মুনাফায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে সিমেন্ট, সিরামিক ও ওষুধ খাতের কোম্পানিগুলো এই জ্বালানি স্বস্তির বড় সুবিধাভোগী হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বিশ্বজুড়ে শান্তি আলোচনার অগ্রগতি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা কমিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে \'রিস্ক-অন\' মেজাজ ফিরিয়ে এনেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারগুলোতে ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তৃতীয়ত, দেশের শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি বিনিয়োগকারীদের মনে এই বিশ্বাস জন্মাবে যে দেশের অর্থনীতি বড় কোনো ঝুঁকির মুখে নেই।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এপ্রিলের এই সময়টি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক বিশেষ মাহেন্দ্রক্ষণ। একদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি ও ভূ-রাজনৈতিক স্বস্তি, অন্যদিকে দেশীয় শক্তিশালী অর্থনৈতিক সূচক—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবে পুঁজিবাজার তার স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার জন্য প্রস্তুত। বিনিয়োগকারীদের ভয় কাটিয়ে যৌক্তিক ও তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাজারে অংশ নেওয়ার এখনই সময়। আশা করা যায়, আগামী রবিবারের লেনদেন বিনিয়োগকারীদের জন্য এক নতুন আশার আলো বয়ে আনবে এবং দেশের পুঁজিবাজার তার ইতিবাচক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবে।

মতামত এর আরও খবর