প্রকাশিত :  ১৫:১৪, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২২

বাংলাদেশঃ পৃথিবীর একমাত্র ভাষা ভিত্তিক দেশ

বাংলাদেশঃ পৃথিবীর একমাত্র ভাষা ভিত্তিক দেশ

|| ইমরান চৌধুরী ||

ভাষা আন্দোলনের সত্তুরতম বার্ষিকী বাঙ্গালী জাতি উদযাপন করছে ২০২২ সালে - আজও অমলিন সেই অনুভূতি, সেই শ্রদ্ধা, সেই সংকল্প , সেই একাত্মতা ; জাতি অবনত চিত্তে স্মরণ করে যাচ্ছে সেই সব বীর বাঙ্গালীদের যারা সেই দিন আত্মবিসর্জন দিয়েছিল জাতির ভাষা আদায়ের বেদীতে, উৎসর্গ করেছিল তাদের বর্তমান আমাদের ভবিষ্যতের নিমিত্তে। “উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই! নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান- ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই!”

বাংলা ভাষা একটি অন্যতম প্রাচীন ভাষা। সেই খ্রিষ্টপূর্ব ৬৫০ সালের (মতান্তরে) আগে থেকেও এই ভাষায় আমাদের পূর্বপুরুষেরা কথোপকথন, লেখাপড়া, গান, শ্লোক, পুথি, কাব্য, হিসাব নিকাস করে আসছে। অন্য দেশের মত নয় যে, এটার উৎপত্তি হয়েছে কয়েকটি ভিন্ন ভাষাভাষীদের মধ্যে একটি জগাখিচুড়ী উর্দু জাতীয় সাধারণ ভাষা নয় বাংলা । 

গঙ্গা বদ্বীপ এর জনগণ মিলিয়ে সারা পৃথিবীতে প্রায় ২৭ কোটি মানুষ এই ভাষায় কথা বলে, পৃথিবীর ষষ্ঠ বৃহত্তম ভাষা এই বাংলা ভাষা। বাঙ্গালীরা পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী - চাইনিজ হান্স এবং আরবদের পরেই বাঙ্গালীদের স্থান । 

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই বাংলার সুজলা, সুফলা ভূমিকে করায়ত্ত করতে চেয়েছে বিভিন্ন উপনিবেশিক পরাশক্তি, আক্রমণকারী জলদস্যু, আগ্রাসী শক্তি, শাসক এবং  ধর্মযাজকের দল - নিয়েছে আমাদের সম্পদ, আমাদের ফসল, দিয়েছে অনেক উন্নত ধরনের চাষাবাদ এর প্রণালি এবং সংজোযন করেছে অনেক ভাষার শব্দ, সৃষ্টি করেছে প্রতিশব্দ - সমৃদ্ধ করেছে শব্দকোষ। কিন্তু কারোরই সাহস হয়নি ভাষা বদলানোর বা কেউই চায়নি একচেটিয়া ভাষাগত আধিপত্য। অনেক অনেক শব্দ, অর্থ, ব্যকরন, উচ্চারণ এসেছে উপ মহাদেশীয় দ্রাবিড় এবং এরিয়ান সংজোযন এর মাধ্যমে, এসেছে পারশ্য থেকে, এসেছে ওলন্দাজদের ভাষা, পর্তুগীজ শব্দে ছয়লাব বাংলা ভাষা যার প্রতিশব্দ আজও আবিষ্কৃত হয় নাই।

বিংশ শতাব্দীতে জেগে উঠে এক নতুন অপরিপক্ব আদর্শ, এক নতুন মতবাদ, এক বিচ্ছিন্ন এবং চাপিয়ে দেওয়া এক জাতিসত্তা, যার ফলশ্রুতিতে জাতিকে সম্পৃক্ত করা হয় এক নব্য উপনিবেশিকতার শৃঙ্খলে - ‘গরম কড়াই থেকে ঝাপ দিয়ে  আগুনে চুলায় অবতরণ করার  মত’ এই মতাদর্শ নিম্মজিত করতে শুরু করে পূর্ব পাকিস্তানিদের। এই যজ্ঞদল পাথর জেঁকে বসে ক্রমশ যার নাভীর নাড়িটা (আমম্বিলিক্যাল কর্ড) ছিল দুর্বল, ছিলোনা কোন প্রকার সাংস্কৃতিক সামঞ্জস্য, ছিল না কোন প্রকার ভাষাগত একাত্মতা। শুরু থেকে দিন দিন প্রতীয়মান হতে থাকে সেই সংযোজনের ভিত্তিপ্রস্তরে ফাটল। শুরু হতে থাকে  বর্ণবাদ, শুরু হতে থাকে কোন দল ধর্মের প্রেক্ষাপটে কারা বেশি ভাল এবং কোন দল  ধর্মানুযায়ী বেশি ভাল নয় এর এক নতুন দাঁড়িপাল্লায়। 

এই সবের মাঝেই একদা বাঙ্গালী আবিষ্কার করল যে এবার তাদের ভাষা ঐ বর্ণবাদী দলের পরবর্তী আগ্রাসনের নিশানা। কিন্তু, সেই অপরিপক্ব নব্য উপনিবেশিক শক্তি ঘুর্ণাক্ষরেও উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিল যে বাঙ্গালীদের মায়ের মুখের কথা, ভাষা, শব্দ, গান, পুথি, শ্লোক যে কত প্রিয় এবং হৃদয়ের কত নিকটতম একটি নিমেসিস (অপরাজেয় সম্পত্তি)।  

ভাষায় আঘাত হানার মধ্য দিয়ে বহ্নি শিখার মত প্রজ্বলিত ভাবে উদ্ভাসিত হতে শুরু করল এক নতুন এবং অপরাজেয় ন্যাশন্যালইজম (জাতীয়তাবোধ)। একঝাঁক তরুণ উৎসর্গ করল সেই ভাষার বেদীতে তাঁদের বর্তমান আমাদের ভবিষ্যৎ এর জন্য। জাতির সেই অগ্রদূত সন্তানরা ক্রমশ রূপান্তারিত হল বাঙ্গালী জাতিয়তাবোধের নতুন পথিকৃৎ হিসেবে। 

১৯৫২ থেকে অনেক বাধা, অনেক বিপত্তি, অনেক নিগৃহতা, অনেক ত্যাগ, অনেক জীবন উৎসর্গ করতে করতে বাঙ্গালী জাতীয়তাবোধের সেই পতাকাকে সংকপ্লতার শিখরে নিয়ে যাবার সেই বন্ধুর পথ ধরে এগিয়ে আসার মাধ্যমে বাঙ্গালী জাতি ১৯৭১ সালে লাভ করে একখন্ড জায়গা যা হল আমাদের সবার প্রিয় বাংলাদেশ। 

ভাষা আন্দোলনের ৭০তম বার্ষিকীর এই ক্ষণে বারংবার শ্রদ্ধা অবনত চিত্তে স্মরণ করছে জাতি সেই ত্যাগী সাহসী বাংলা মায়ের সূর্য সন্তানদের যাঁদের কাছে আমাদের অনাগত বংশধররা যে কত ঋণী তা প্রকাশ করার জন্য। ওঁদের আত্মউৎসর্গের দ্রবণের প্রধান উপাদান আমাদের মায়ের ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার উচ্চাসনে মর্যাদার পথ ধরেই আজ বাংলাদেশের উত্থান। 

তাই, পৃথিবীর সবাইকে এই ভাষা দিবসের ক্ষণে মনে করিয়ে দিতে চাই, বাংলাদেশই একটি মাত্র দেশ যার জন্ম হয়েছে তার ভাষার কারনে - ‘পৃথিবীর একমাত্র ভাষা ভিত্তিক দেশ! বাংলাদেশ।





Leave Your Comments


মতামত এর আরও খবর