img

স্বাধীনতা দিবস - ইতিহাস সংরক্ষন প্রসঙ্গে!

প্রকাশিত :  ১২:২১, ২৮ মার্চ ২০২২

স্বাধীনতা দিবস - ইতিহাস সংরক্ষন প্রসঙ্গে!

আবার এসে গেছে আমাদের স্বাধীনতার জন্মবার্ষিকী - ৫১তে বাংলাদেশ। জাতির জীবনের অন্যতম একটি মহান দিবস। বাঙ্গালী জাতীয়তা উজ্জীবনের সেই মহান ক্রান্তিকাল। অনেক বন্ধুর পথ পরিক্রমণ করে জাতি উপস্থিত হয়েছিল সেই ২৬ সে মার্চ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার এক উদ্দ্যম প্রতয় নিয়ে। পৃথিবীর মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি দেশকে আমাদের মত সংগ্রাম - যুদ্ধ - চরম ত্যাগ এর মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করতে হইয়েছিল। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ এই ক্রান্তিকাল ছিল সব ধরনের সময় থেকে কঠিনতম; শতকরা ৫২ শতাংশ জনবল নিয়েও ইস্ট পাকিস্তান পরিগণিত ঐ বর্বর পাকিস্তানী শাসকদের কাছে নিছক একটা সংখ্যালঘু অঞ্চলে।  প্রথমে কেড়ে নিতে চেয়েছিল আমাদের মায়ের ভাষা - বাংলাকে, তারপর শুরু করল অর্থনৈতিক উপনিবেসকিতা - বর্ণবাদ - নিগৃহতা - শোষণ এবং বৈষম্য। কেড়ে নিতে শুরু করল এক এক করে সকল গনতান্ত্রিক অধিকার - ভোটের রেজাল্ট এর প্রতি অনিহা এবং সরকার গঠন না করতে দেয়ার টালবাহানার অন্তরালে এক জেনোসাইডের নীল নকশা প্রণয়ন। 

জাতির সেই উত্তাল সময়ে জেগে উঠতে শুরু করে এক নব্য বাঙ্গালী জাতীয়তাবোধ - বাংলার শতাব্দী পুরোনো ঐতিহ্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি অনুযায়ীই শত্রুর আগ্রাসন মোকাবেলায় যখন এগিয়ে যেতে চাইল তখন একটি অতি উৎসাহী ধর্মীয় রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় গ্রুপ, ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত একটি শ্রেণী সবার দৃষ্টির অগোচরে গোপনে হাত মিলায় ঐ বর্বর পাকিস্তানী পাঞ্জাবীদের সাথে - নিজ জাতির ইচ্ছা - আকাক্সক্ষা, শপথের এবং স্বাধিকার আদায়ের বিরুদ্ধে।

অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে জাতির সেই দুঃসময়ে এই সম্প্রদায়ের বিশ্বাসঘাতকতা ছিল এক বিশাল অনভিপ্রেত ষড়যন্ত্র। অত্যন্ত অনুতাপের সাথে আজকের একবিংশ শতাব্দীতে এসেও ওদের সেই বিশ্বাসঘাতকতার রেশ জাতি কাটিয়ে উঠতে পারছে না। 

বাংলাদেশ আজ অর্ধশতাব্দী যাবত স্থাপিত - স্বাধীনতা অর্জনের বেদীতে বলিদান করতে হয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষদেরকে, যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে লক্ষ লক্ষ মা বোনদেরকে, নয় মাসব্যাপী আগ্রাসন এবং অত্যাচারে জাতির এবং দেশের  অবোকাঠামো, অর্থনীতি সব কিছুই ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছিল সেই বর্বর পশু পাকিস্থানী পাঞ্জাবী বাহিনী এবং ওদের আমাদের দেশের দালাল এবং দোশররা । 

সেই উত্তাল সময় অতিক্রম  করে আজ ৫১টি বছরে বাঙ্গালী জাতি পদার্পণ করেছে। গর্বে এবং প্রত্যয়ে জাতি আজ এক নতুন উন্নয়নের সোপানে চড়ে হিমালয় চূড়ার দিকে আগাচ্ছে সদর্পে। কিন্তু কেন জানি বারবার হোচট খেতে হচ্ছে জাতিকে ঐ   পুরানো হেরে যাওয়া শত্রুদের ষড়যন্ত্রে। নব্য নব্য ইজম এবং নতুন নতুন দাবার চাল চালিয়ে কেমন জানি মতিভ্রস্ট করে ফেলছে যুবসমাজ, অর্ধ বয়সী যুবক যুবতীদের সহ বালক বালিকাদের। মস্তিষ্ক হনন এর মত এক ষড়যন্ত্রের মাতমে মেতে উঠেছে ঐ গোষ্ঠী অবারিত ভাবে - উঠেপড়ে লেগেছে জাতির আগামী প্রজন্মের সন্তানদেরকে ইতিহাস বিচ্ছিন্ন করতে, দেশজ ইতিহাস এর প্রতি উন্নাসিকতা সৃষ্টি করার জন্য, স্বাধীনতার সেই অমানবিক অত্যাচারের ইতিহাসকে মিথ্যা বড় গলায় আওয়াজ করে করে প্রমানিত করতে চাচ্ছে সত্যকে মিথ্যা হিসাবে, ইনিয়ে বিনিয়ে, গানে গানে, সলোক, পুথি, গান এবং কৌতুক এর মাধ্যমে পানি ঢেলে সেই গর্বের ইতিহাস কে তরলায়ন করা হচ্ছে প্রত্যহ। অবজ্ঞায় রূপান্তারিত করা হচ্ছে জাতির সূর্য সন্তানদের আত্মত্যাগকে, যুবকদেরকে, তরুণদের শিখানো হচ্ছে ভিন দেশী বিতর্কিত ব্যক্তি, জেনোসাইড সংঘটনকারীদের বীর হিসাবে ঝান্ডা বহনকারী বিশাল মানব হিসাবে। গন আয়োজিত বিশাল সব মন্ডপে রাত দিন চলছে বাঙ্গালী জাতির প্রজ্ঞা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিতে এবং বহু জাতি এবং বহু ধর্ম, বহু বর্ণ নিয়ে শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থান আকাঙ্খাকে সমূলে উৎপাটনের অপচেষ্ঠা। কিশোর, কিশোরী, যুবক, যুবতী, পুরুষ এবং মহিলারা অধিকাংশই আজ কেমন জানি বিচ্ছিন্ন বাংগালীত্ব এবং বাংলা কৃষ্টির  প্রতি ক্রমশ। এই জাতির চার হাজার বছরের সবচে বিশাল মাইলফলক আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ঐ স্বাধীনতা যুদ্ধের ত্যাগ এর গৌরব এর প্রতি নিয়ে এসেছে এক উন্নাসিকতা এবং সন্দেহ। আদৌ কি এসব সত্যি?  

অনুপ্রবেশ করানো হয়েছে ঐ কোমলমতি মস্তিকে ভিন্ন ধরনের সন্দেহ এবং বিশ্বাসযোগ্যতা। আর যার জন্য দেশে এবং বিদেশের অভিবাসী কিশোর, কিশোরী, যুবক, যুবতী, পুরুষ এবং মহিলারা বিভ্রান্ত নিজেদের পূর্বপুরুষদের ইতিহাস, শৌর্য-বীর্য, ত্যাগ এবং মহিমার ব্যাপারে। জাতির গর্বে যারা গর্বিত নয় যারা দেশের জনগণের ইচ্ছা ও আকাঙ্খার সাথে সম্পৃক্ত নয় - তারা কতটুকু দেশপ্রেমিক এবং মুখের বুলি কতটুকু বিস্বাসযোগ্য তা একটা ভাবারও বিষয়, যারা তাদের জাতির মা ও বোনদের ইজ্জৎ, সম্ভ্রম এর প্রতি উন্নাসিক এবং স্বীকার করতে উৎসুক নয় তাদের দেওয়া বক্তব্য কতটা সচ্ছল এবং সত্য এই ব্যাপারে যুবক, কিশোর, বয়স্কদের ভেবে দেখা উচিত । 

একটা প্রবাদবাক্য আছে উন্নত বিশ্বে, যে ব্যক্তি জানেনা সে কোথা থেকে এসেছে, সে কিভাবে জানবে তার জীবনে তাকে কোথায় পৌঁছুতে হবে! এটা অত্যন্ত অনভিপ্রেত হবে যদি বাঙ্গালী জাতির আগামী প্রজন্মের অব্যস্থা এক রকম হয়। ১৯৭১ আমাদের জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মাইল ফলক। ১৯৭১ সাল আমাদের জাতি গোষ্ঠী এনে দিয়েছে এক নতুন পরিচয়। বাঙ্গালীরা পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী - বাংলা ভাষা পৃথিবীর পঞ্চম ভাষা। কিন্তু, এত কিছু থেকেও আমরা জানিনা কেন  বারবার হোছট খাচ্ছি বিভিন্ন ভাবে - আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে তেমন কোন প্রকাশনা নেয় - একাডেমিক দিক থেকে; নেই তেমন থিসিস পেপার, নেই তেমন কোন অনুসন্ধান কেন্দ্রিক পেমপ্লেট  বা এছে (রচনা) । নেই তেমন কোন বই যাতে আছে উদ্ধৎিেতর সূত্র এবং বীব্লিওগ্রাফই। যেটা পড়লে নতুন প্রজন্মের পাঠক হয়ে  ঊঠবে গবেষক এবং ঐ সব সূত্র ধড়ে ধরে বেড় করতে পারবে আরও অনেক না  জানা তথ্য - উপাত্ত এবং নিজেরাও উদ্ভূত হবে স্বাধীনতা নিয়ে লেখতে - ঐ ভাবেই আগামীতে যুগে যুগে শতাব্দী পর শতাব্দী যাবত বাঙালী জাতীর প্রজন্মরা পৃথিবীর সব আনাচে কানাচে অবস্থিত বাঙ্গালী ডিয়াস্পরা এবং বাংলাদেশে বসবাসকারী আগামী জেনারেশন এর পর জেনারেশনগুলোকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস পৌঁছে দিতে পারবে। সেই সাথে আগমনী জেনারেশন তাদের পূর্বপুরুষদেরকে নিয়ে গর্ববোধ করবে। সেইদিনই  হয়ত আমাদের প্রজন্ম স্বাধীনতা দিবসকে উদযাপন করবে গর্ব নিয়ে। ঐ আগামী প্রজন্মের গর্বপ্রসূত সংরক্ষিত ইতিহাসভিত্তিক বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস পালনের প্রত্যাশায় অপেক্ষায় থাকবে জাতি এটাই প্রত্যাশা ।

ইমরান চৌধুরী: লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


img

চুপ্পুর পদত্যাগ নিয়ে কিছু কথা

প্রকাশিত :  ০৯:৩৪, ০৪ আগষ্ট ২০২৬

আবদুল হামিদ মাহবুব

মো. শাহাবুদ্দিন চুপ্পু অবশেষে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। অনেক দিন ধরেই এই পদত্যাগ নিয়ে আলোচনা চলছিল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকেই তার পদে থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং আন্দোলনকারীদের একটি অংশ মনে করতেন, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার এই পদে থাকা উচিত নয়। আবার অন্যরা বলেছিলেন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করাও জরুরি। এই দুই অবস্থানের টানাপোড়েনের মধ্যেই তিনি দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

তার পদত্যাগপত্র প্রকাশের পর নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ তিনি শুধু পদত্যাগ করেননি। দীর্ঘ একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। সেখানে তিনি নিজের দায়িত্ব পালনের মূল্যায়ন করেছেন। সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলায় নিজের ভূমিকার কথাও বলেছেন। একই সঙ্গে নিজের গুরুতর অসুস্থতার বর্ণনাও দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, একটি পদত্যাগপত্রে এত কিছু বলার প্রয়োজন ছিল কি?

রাষ্ট্রপতির পদ একটি সাংবিধানিক পদ। এই পদে থাকা ব্যক্তি শুধু একজন ব্যক্তি নন। তিনি রাষ্ট্রের একটি প্রতীকও। তাই তার প্রতিটি বক্তব্য গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে বিদায়ের সময় লেখা একটি চিঠি ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। সেই কারণে তার প্রতিটি শব্দ নিয়েও আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক।

তিনি লিখেছেন, তিনি নিষ্ঠা, সততা এবং সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। এটি তার নিজের মূল্যায়ন। কিন্তু একজন রাষ্ট্রপতির কাজের প্রকৃত মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত জনগণ, ইতিহাস এবং গবেষকরাই করবেন। নিজের কর্মের প্রশংসা নিজে করলে সেটি সব সময় সবাই গ্রহণ করবেন, এমন নয়। তিনি আরও বলেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনার পর দেশে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছিল। সেই সংকট থেকে বের হতে তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত নেন। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করেন। তিনি এটাও বলেছেন, তার ইতিবাচক ভূমিকার কারণে দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।

এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেবে। কারণ সেই সময়ের ঘটনাকে সবাই একইভাবে দেখেন না। কেউ মনে করেন রাষ্ট্রপতি প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। আবার কেউ মনে করেন, তিনি পরিস্থিতির চাপে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আরও অনেকে বলেন, তার আগে নেওয়া নানা সিদ্ধান্তের কারণেই তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ফলে তার নিজের ভূমিকার এমন প্রশংসা বিতর্ককে আরও বাড়াতে পারে।

সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে তার অসুস্থতার বর্ণনা। তিনি লিখেছেন, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতা এবং অটোনোমিক নিউরোপ্যাথিতে তিনি ভুগছেন। তিনি বলেছেন, মাঝে মাঝে তিনি অচেতন হয়ে যান। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসারও প্রয়োজন রয়েছে।

অসুস্থতার কারণে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়; এটি একটি গ্রহণযোগ্য কারণ। যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা প্রয়োজন। একজন রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন তিনি আর সেই দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না, তাহলে পদত্যাগ করাই যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন উঠে আসে। যদি মূল কারণ অসুস্থতা হয়, তাহলে এত দীর্ঘ ব্যাখ্যার প্রয়োজন ছিল কেন? তিনি চাইলে খুব সংক্ষিপ্ত ভাষায় বলতে পারতেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করা আর সম্ভব নয়। তাই সংবিধান অনুযায়ী আমি পদত্যাগ করছি। এতটুকুই যথেষ্ট হতো। এতে কোনো বিতর্কও তৈরি হতো না।

বরং দীর্ঘ ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি যেন নিজের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ভূমিকার একটি ব্যাখ্যা রেখে যেতে চেয়েছেন। অনেকের কাছে সেটি আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা বলেও মনে হতে পারে। কারণ পদত্যাগপত্র সাধারণত নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার জায়গা নয়। এটি মূলত দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার একটি আনুষ্ঠানিক নথি।

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকেই রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে বিতর্ক ছিল। আন্দোলনকারীদের একটি অংশ শুরু থেকেই তার অপসারণ দাবি করেছিল। রাষ্ট্রপতি ভবন ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচিও হয়েছিল। তখন যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তাকে সরালে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হতে পারে। তাই তাকে পদে রাখা হয়। সেই সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না ভুল ছিল, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু এটাও সত্য, সেই সময় দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রশ্নটি সামনে ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে কঠিন বাস্তবতা ছিল। তাই তারা কোন যুক্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেটিও আলোচনার বিষয়।

এখন তিনি বিদায় নেওয়ার সময় নিজের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। এতে যারা এত দিন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার যুক্তি দিয়েছিলেন, তাদের অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠতেই পারে। কারণ রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যকে অনেকেই রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখবেন।আরেকটি প্রশ্ন এখন জনমনে ঘুরছে। তিনি কি ভবিষ্যতে আইনের আওতায় আসবেন? এ প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই তিনি আইনি দায়ে দোষী হয়ে যান না। অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত হতে হবে। প্রমাণ থাকলে বিচার হবে। আদালতই শেষ কথা বলবেন।

তার অতীত ভূমিকা নিয়ে নানা সময়ে রাজনৈতিক মহলে সমালোচনা হয়েছে। দুদকে দায়িত্ব পালন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে নেওয়া সিদ্ধান্ত এবং অন্যান্য দায়িত্ব নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ও বিতর্ক রয়েছে। আবার এসব অভিযোগের অনেকগুলোর বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায়ও নেই। তাই আইন ও সংবিধানের পথেই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার স্বাক্ষরে তৎকালীন সরকারের অনেক সিদ্ধান্ত সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অংশ হয়েছে। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত বা ফৌজদারি দায়—এই দুটি বিষয় এক নয়। যদি কেউ মনে করেন তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বা আইনের লঙ্ঘন করেছেন, তাহলে তারও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বিচার হতে হবে। আবেগ নয়, প্রমাণই সেখানে প্রধান বিষয়।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান বড়।কোনো ব্যক্তি আজ ক্ষমতায় থাকবেন, কাল থাকবেন না। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকবে। তাই প্রতিটি সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তির উচিত এমনভাবে দায়িত্ব পালন করা, যাতে তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে। কারণ রাষ্ট্রপতির প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হলে রাষ্ট্রের মর্যাদাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

চুপ্পুর পদত্যাগ একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি। কিন্তু এর মাধ্যমে অনেক প্রশ্নের শেষ হয়নি। বরং নতুন করে অনেক প্রশ্ন সামনে এসেছে। কেন তিনি এত দিন পদে ছিলেন? কেন বিদায়ের সময় এত ব্যাখ্যা দিলেন? তার ভূমিকার প্রকৃত মূল্যায়ন কী হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে।

ইতিহাস খুব ধৈর্য নিয়ে বিচার করে। ইতিহাস কারও আত্মপ্রশংসা দেখে সিদ্ধান্ত দেয় না। আবার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগ শুনেও সিদ্ধান্ত দেয় না। ইতিহাস দলিল দেখে। ঘটনা দেখে। মানুষের অভিজ্ঞতা দেখে। এরপর রায় দেয়।

চুপ্পুর পদত্যাগপত্র হয়তো একদিন গবেষণার বিষয় হবে। সেখানে তার দাবি যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে সমালোচনাও। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তখন বিচার করবে, তিনি সত্যিই সাংবিধানিক সংকট রক্ষা করেছিলেন, নাকি কেবল নিজের ভূমিকার পক্ষে একটি ব্যাখ্যা রেখে গেছেন।

সবশেষে একটি কথাই বলা যায়। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী। পদও স্থায়ী নয়। কিন্তু মানুষের কর্ম ইতিহাসে থেকে যায়। তাই বিদায়ের সময় সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত বিনয়। সবচেয়ে বড় ভাষা হওয়া উচিত সংযম। আর সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত জবাবদিহি। একটি সংক্ষিপ্ত ও মর্যাদাপূর্ণ পদত্যাগপত্র হয়তো আরও কম বিতর্ক তৈরি করত। কিন্তু দীর্ঘ ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি নিজের বিদায়কেই আবারও নতুন বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব  ও  যুগ্ম সাধারণ  সম্পাদক, মৌলভীবাজার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল। মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪
ই-মেইল: [email protected]

মতামত এর আরও খবর