img

গাড়িতে উঠলেই ঘন ঘন বমি, কেন এমন হয় কেন জানেন?

প্রকাশিত :  ১০:১৩, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গাড়িতে উঠলেই ঘন ঘন বমি, কেন এমন হয় কেন জানেন?

কোথাও ভ্রমণে যাচ্ছেন। গাড়িতে ওঠার কিছুক্ষণ পরে বমি বমি ভাব দেখা দিল। এমন অনেকের ক্ষেত্রেই হয়, যদিও সবার এমন হয় না।

এমন অনেকেই আছেন, গাড়িতে ওঠার পরই শুরু হয় অস্বস্তি। কেউ কেউ দীর্ঘযাত্রার পর বমি বমি ভাবে ভোগেন। উঁচু-নিচু সড়ক, পাহাড়ি পথ, যানবাহনে ক্রমাগত ঝাঁকুনি এবং যানবাহনের ভেতরে থাকা বাজে গন্ধ এ সমস্যা বাড়িয়ে তুলতে পারে।

যদিও গাড়িতে চলার সময়ে বমি হওয়া খুব পরিচিত একটি সমস্যা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, এটিকে মোশন সিকনেস বলা হয়ে থাকে। ভ্রমণ করার সময়ে এমনটি কেন হয়? মন, চোখ ও শরীরের ভারসাম্যের মধ্যে সম্পর্ক কী? এটি কী প্রতিরোধ করা সম্ভব?

আমাদের মস্তিষ্কে ফ্লুইড রয়েছে। ভ্রমণের সময়ে এই ফ্লুইড যখন নাড়া খায়, তখন এটিতে কম্পন তৈরি হয়, যা গলায় পৌঁছায়। গলা নড়াচড়ার ফলে সেই কম্পনগুলো চলে যায় মাথার খুলিতে। এ প্রক্রিয়া মস্তিষ্কের ব্যালেন্স বাধাগ্রস্ত করে এবং এর ফলে বমি বমি ভাব, মাথাঘোরা ও অস্বস্তির মতো সমস্যা তৈরি করে। যখন তা সহ্য করার মতো থাকে না, তখন বমি হয়।

এ বিষয়ে দিল্লির স্যার গঙ্গা রাম হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মহসিন ওয়ালি বলেন, ভ্রমণের সময়ে পাকস্থলীর অবস্থাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। যারা খালি পেটে বা কিছু না খেয়ে ভ্রমণ করেন, পাকস্থলীতে থাকা ভেগাস নার্ভ (যেটি হৃৎপিণ্ড ও গলার নার্ভের সঙ্গে সম্পৃক্ত) আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। ভারি খাবারের পর যারা ভ্রমণ করেন, তাদের বমি হতে পারে। 

তিনি বলেন, মোশন সিকনেস সব সময় কেবল ভ্রমণ সম্পর্ককৃত সমস্যা নয়। কখনো কখনো এটি হতে পারে মস্তিষ্কের কোনো ব্যাধির একটি উপসর্গ কিংবা ওষুধের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তো ব্রেন টিউমারের উপসর্গ পর্যন্ত হতে পারে মোশন সিকনেস।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে—মোশন সিকনেস কী? মোশন সিকনেস হচ্ছে— এমন এক অবস্থা, যখন কোনো ব্যক্তি গাড়িতে ভ্রমণ করার সময়ে মাথাঘোরা, মাথাব্যাথা বা অস্থিরতায় ভোগেন ও বমি করেন। এ সমস্যা প্রায়ই দেখা দেয় কার, বাস, ট্রেন, জাহাজ বা উড়োজাহাজে ভ্রমণের সময়ে। কিছু মানুষ এ সমস্যায় আরও বেশি ভোগেন পাহাড়ি রাস্তায়। আর সাগর কিংবা আকাশে ভ্রমণের সময়ে যে ধরনের সমস্যা হয়, সেটির সঙ্গে যানবাহনে সৃষ্ট সমস্যার মিল রয়েছে।

ডা. মহসিন ওয়ালি বলেন, আপনি যদি গাড়ি বা বাসে বসে থাকেন, নিচের দিকে তাকিয়ে থাকেন কিংবা কোনো বই পড়তে থাকেন, তাহলে আপনার চোখ মস্তিষ্ককে বোঝাবে যে আপনি নড়ছেন না। কিন্তু আপনার কানের ব্যালেন্স সিস্টেম মস্তিষ্ককে ঠিকই জানাবে যে শরীরটা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরছে। এ ধরনের সংকেতগুলো শরীরকে বোঝায় যে, বিষাক্ত কিছু শরীরে প্রবেশ করেছে। আর শরীর জানে যে বিষাক্ত কিছু বের করার একমাত্র উপায় হলো বমি করা। আর এটি এড়ানোর একমাত্র উপায় হলো জানালা দিয়ে বাইরে দূরে তাকানো। এটি চোখ ও কান থেকে পাওয়া সংকেতের সঙ্গে মেলে এবং অস্বস্তি কমায়।

ডা. মহসিন ওয়ালি বলেন, প্রাথমিক কারণটি হলো রক্তচাপ। নারীদের তুলনায় পুরুষদের গড় রক্তচাপ বেশি। অনেক নারী গৃহস্থালী কাজে, বিশেষ করে রান্নাঘরে দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন। এভাবে টানা দাঁড়িয়ে থাকা রক্তচাপ কমার কারণ হতে পারে। এটিকে পোশ্চারাল হাইপোটেনশন বলা হয়ে থাকে। এর ফলে মাথাঘোরা, বমি বমি ভাব এবং মোশন সিকনেসের উপসর্গ বাড়তে পারে। নারীদের শরীরে নিয়মিত হরমোনের পরিবর্তন ঘটে। এটিও অন্যতম একটি কারণ। মেন্সট্রুয়েশন বা মাসিকের সময়ে শরীরে লবণ, পানি ও ইলেকট্রলাইটের ক্রমাগত পরিবর্তন হয়। মাসিকে বেশি রক্ত গেলে শরীরে রক্তচাপ আরও কমতে পারে। এতে মোশন সিকনেসের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে ব্যাখ্যা করেন তিনি।

তিনি বলেন, নারীদের মস্তিষ্ক পুরুষদের তুলনায় গড়ে ১৫০ মিলিলিটার ছোট। তিনি মনে করেন, এটি সম্ভবত মস্তিষ্কে বাইরের প্রভাবে নারীদের সহজেই প্রভাবিত করে। নিম্ন রক্তচাপ, পোশ্চারাল হাইপোটনেশন, হরমোনের পরিবর্তন এবং শরীরের গঠন - সবকিছুই নারীদের মধ্যে মোশন সিকনেসের প্রবণতা বেশি হওয়ার কারণ।

এ বিষয়ে বিবিসির সংবাদদাতা কাটিয়া মস্কভিচের করা এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোশন সিকনেস একটি ব্যাধি। এতে ভোগেন প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন। মোশন সিকনেসে কে, কখন প্রভাবিত হবেন সেটির ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব নয় এবং এর কোনো নিরাময় নেই। আর মোশন সিকনেসের কারণ হলো— আমাদের শরীরের ব্যালেন্স সিস্টেম সঠিকভাবে সমন্বয় বা তাল মেলাতে পারে না। মূলত কানের অভ্যন্তরে থাকা ব্যালেন্স অরগানের (ভেস্টিবুলার সিস্টেম) সঙ্গে শরীরের এই ব্যালেন্স সিস্টেম সংযুক্ত।

আবার অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসের নিউরোলজি ডিপার্টমেন্টের ডা. মানজারি ত্রিপাঠির ভাষ্য অনুযায়ী, যখন আমরা বাস, কার, ট্রেন বা উড়োজাহাজে ভ্রমণ করি, সে সময়ে চোখ, কান ও শরীরের অন্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে মস্তিষ্কে যে তথ্য যায়, সেগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি মেলে না। এ বিষয়টি ব্যালেন্সের সঙ্গে সম্পৃক্ত রিসেপটরকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে। ফলে ব্রেনস্টেম বা হাইপোথ্যালামাসের মতো মস্তিষ্কের কিছু অংশ উদ্দীপিত হয় এবং এতে করে মাথা ঘোরায় ও বমি হয়।

তিনি বলেন,  আপনার শরীরের নড়াচড়া বোঝে যে, রিসেপটরগুলো, সেগুলোর সঙ্গে কানের অভ্যন্তরীণ ব্যালেন্স সিস্টেমে ব্যাঘাতই হলো মোশন সিকনেসের কারণ। আপনার চোখ যা দেখছে এবং ভেতরের কান ও পেশি থেকে আসা সংকেতের মধ্যে মিল খুঁজে পায় না।

ডা. ত্রিপাঠি বলেন, আমাদের শরীরের বিশেষ কিছু সেন্সর রয়েছে, যেগুলোকে আমরা রিসেপটর বলি। রিসেপটরগুলো বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনগুলো বুঝে নিয়ে মস্তিষ্ককে সেগুলো জানায়।

ডা. ত্রিপাঠি বলেন, আর পুরুষদের চেয়ে নারীরা মোশন সিকনেসে বেশি ভোগেন। এর নেপথ্যে বিভিন্ন শারীরিক ও হরমোনজনিত কারণ রয়েছে। নারীদের জীবনযাত্রা পুরুষদের তুলনায় ভিন্ন এবং এই কারণে এই সমস্যা নারীদের মধ্যে বেশি।

ভ্রমণে করণীয়

১. খালি পেটে ভ্রমণ করবেন না। সামান্য হালকা খাবার বা স্ন্যাক্স খান। 

২. ভারি খাবার এড়িয়ে চলা। ডা. মহসীন ওয়ালি ভ্রমণের একদম আগ দিয়ে খুব বেশি না খেতে পরামর্শ দিয়েছেন।

৩. সামনে দেখা যায় এমন আসনে বসুন কিংবা সামনের আসন পছন্দ করুন; যদি সম্ভব হয় নিজে গাড়ি চালান।

৪. শরীরের অবস্থান স্থিতিশীল রাখুন। মাথা, কাঁধ, কোমর ও হাঁটুর নড়াচড়া কমান।

৫. প্রয়োজনে বমি প্রতিরোধকারী ওষুধ সেবন করুন।

৬. বমি বমি অনুভব করলে সঙ্গে সঙ্গে থামুন– সড়কের পাশে যানবাহন থামান। উল্টো দিকে যান এবং এরপর পুনরায় যাত্রা শুরু করুন।

৭. চলন্ত যানবাহনে ঘুমাবেন না। ঘুমন্ত অবস্থায় ভারসাম্য স্বাভাবিক থাকে না এবং বমির আশঙ্কা বাড়ে।

৮. নিকোটিন এড়িয়ে চলুন। যারা ধূমপান করেন, বমি করার সম্ভাবনা তাদের বেশি।

img

ফ্রিজে কোরবানির মাংস সংরক্ষণের সঠিক পদ্ধতি

প্রকাশিত :  ১৬:৫০, ১৭ মে ২০২৬

কোরবানির ঈদে মাংস সংরক্ষণ নিয়ে প্রায় সব পরিবারকেই বাড়তি প্রস্তুতি নিতে হয়। বিশেষ করে দীর্ঘ ছুটি, অতিথি আপ্যায়ন ও একসঙ্গে বেশি পরিমাণ মাংস সংরক্ষণের কারণে অনেক সময় ফ্রিজ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম দেখা দেয়। সঠিক নিয়ম না মানলে মাংসের স্বাদ, গন্ধ ও পুষ্টিগুণ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তাই কোরবানির মাংস দীর্ঘদিন ভালো রাখতে হলে সংরক্ষণের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম মেনে চলা জরুরি।

ফ্রিজের খাবার আগেই গুছিয়ে রাখা

কোরবানির আগে ফ্রিজ পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো। দীর্ঘদিন জমে থাকা পুরোনো বা অপ্রয়োজনীয় খাবার সরিয়ে ফেললে নতুন মাংস সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা তৈরি হয়। একই সঙ্গে ফ্রিজের তাপমাত্রাও ঠিকভাবে বজায় থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত ভরে ফেললে ফ্রিজের ঠান্ডা বাতাস ঠিকভাবে চলাচল করতে পারে না, ফলে খাবার দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

মাংস সংরক্ষণে করণীয়

কোরবানির মাংস ফ্রিজে রাখার আগে ভালোভাবে রক্ত ঝরিয়ে নিতে হবে। মাংস ধোয়ার পর অতিরিক্ত পানি থাকলে তা শুকিয়ে নেওয়া জরুরি। ভেজা অবস্থায় সংরক্ষণ করলে বরফ জমে মাংসের স্বাভাবিক স্বাদ ও গঠন নষ্ট হতে পারে। এরপর পরিষ্কার ও ঢাকনাযুক্ত পাত্র কিংবা ভালো মানের ফুড-গ্রেড পলিব্যাগে ভরে সংরক্ষণ করা উচিত। খোলা অবস্থায় মাংস রাখা একেবারেই নিরাপদ নয়।

ছোট ছোট ভাগে মাংস সংরক্ষণ

মাংস বড় আকারে না রেখে ছোট ছোট ‘ফ্যামিলি প্যাক’ আকারে ভাগ করে রাখলে ব্যবহার সহজ হয়। এতে প্রতিবার প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ মাংস বের করা যায় এবং পুরো মাংস বারবার গলাতে হয় না। কারণ একবার গলানো মাংস পুনরায় ফ্রিজে রাখলে এর মান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর ঝুঁকি বাড়ে।

কাঁচা ও রান্না খাবার আলাদা রাখা

ফ্রিজে কাঁচা মাংস কখনো রান্না করা খাবার, ফল বা সবজির পাশে রাখা উচিত নয়। কাঁচা মাংসের গন্ধ ও জীবাণু অন্য খাবারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এজন্য ফ্রিজে কাঁচা মাংসের জন্য আলাদা একটি নির্দিষ্ট অংশ রাখা ভালো। এতে খাবারের নিরাপত্তা বজায় থাকে।

বিদ্যুৎ গেলে ফ্রিজ বেশি না খোলা

বিদ্যুৎ চলে গেলে সেই অবস্থায় ফ্রিজ বারবার খোলা ঠিক নয়। ফ্রিজের দরজা বন্ধ থাকলে দীর্ঘ সময় ভেতরের ঠান্ডা তাপমাত্রা বজায় থাকে এবং খাবার নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমে।

কতদিন পর্যন্ত ভালো থাকে মাংস 

সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হলে কোরবানির মাংস সাধারণত ফ্রিজারে প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত ভালো থাকতে পারে। তবে দীর্ঘদিন রাখলে ধীরে ধীরে স্বাদ ও পুষ্টিগুণ কমতে শুরু করে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মাংস ব্যবহার করাই সবচেয়ে ভালো।