img

বন্ধ হোক জাতীয় সংসদে ইংরেজির যথেচ্ছ ব‍্যবহার

প্রকাশিত :  ০৫:১০, ০২ এপ্রিল ২০২৬

বন্ধ হোক জাতীয় সংসদে ইংরেজির যথেচ্ছ ব‍্যবহার

সারওয়ার-ই আলম

জাতীয় সংসদের কয়েকটি অধিবেশন দেখে মনে হলো স্পীকার হাফিজ উদ্দিন , স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ, সংসদ সদস‍্য আ‍ন্দালিব রহমান পার্থ ও অন‍্যান‍্যরা যেন একটানা কয়েক মিনিটও বাংলায় কথা বলতে সক্ষম নন। তাঁদের ইংরেজি বলা চাই-ই চাই! এমন অনেক ইংরেজি শব্দ তাঁরা ব‍্যবহার করছেন যেসব শব্দের বহুল প্রচলিত বাংলা শব্দ রয়েছে। বাংলার প্রতি জাতীয় সংসদে স্পীকারের ও সদস‍্যদের এই অবজ্ঞা প্রদর্শন শুধু অনাকাঙ্খিত-ই নয় অগ্রহণযোগ‍্যও বটে। কারণ বাংলা এতটা পঙ্গু ভাষা নয় যে ইংরেজির ওপর ভর দিয়ে দিয়ে তাকে চলতে হবে। সংসদে তাঁদের কথা শুনে মনে হয় বাংলা একটি পঙ্গু ভাষা। ইংরেজি না বললে এর অর্থ পরিস্কার হয় না। কী দুঃখজনক! এই হলো আমাদের স্পীকার, মন্ত্রী ও সংসদ সদসদ‍্যদের দেশপ্রেম ও ভাষাপ্রেমের নমুনা। এরাই আবার সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করার জন‍্য জাতিকে সবক দেবে। একদিকে আমরা বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবী করছি, অন‍্যদিকে আমাদের জাতীয় সংসদে স্পীকার ও সংসদ সদস‍্যগণ অপ্রয়োজনে ইংরেজি ব‍্যবহার করছেন। কী হাস‍্যকর ব‍্যাপারটা!

আজ এক ভিডিওতে দেখলাম, স্পীকার বলছেন— \"বিরোধী দলের সদস‍্যরা কোন সদস‍্য যখন বক্তৃতা দেয় তখন কোনো কমেন্ট করবেন না, তাকে ডিসট্রাক্ট করার চেষ্টা করবেন না, প্লিজ লিসেন টু হিম, ইউ উইল গেট ইউর টার্ণ\"।

এখানে স্পীকার কি একেবারেই অপ্রয়োজনে ইংরেজি ব‍্যবহার করলেন না? তিনি তো কোনো ইংরেজি শব্দ ব‍্যবহার না করেই উপরের কথাগুলো বিশুদ্ধ বাংলায় খুব সহজে সুন্দর করে বলতে পারতেন এভাবে— বিরোধী দলের সদস‍্যরা কোনো সদস‍্য যখন বক্তৃতা দেয় আপনারা কোনো মন্তব‍্য করবেন না। তার মনযোগ নষ্ট করার চেষ্টা করবেন না। অনুগ্রহ করে তার কথা শুনুন। আপনারাও কথা বলার সুযোগ পাবেন।

স্পীকার এভাবে বললে কতই না মধুর শোনাতো। এখানে কোন শব্দটি জটিল বা অপ্রচলিত বাংলা শব্দ? একটিও তো না। তাহলে কেন স্পীকার ডিস্ট্রাক্ট, কমেণ্ট, প্লিজ লিসেন টু হিম, ইউ উইল গেট ইউর টার্ণ ব‍্যবহার করলেন? দেশের কতজন মানুষ স্পীকারের ভাষা পুরোপুরি বুঝবেন?

আরেকদিন দেখলাম শিক্ষামন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় বলছেন— \"অ‍্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ব‍্যাপার অ‍্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ওয়েতে হবে। লিভ ইট টু আস। আমরা তো কাজ করছি। লটারি ইজ নট অ‍্যা সলিউশন ফর অ‍্যাডমিশন। অ‍্যাবসোলিউটলি। আপনি মেধাকে কোন ব‍্যারোমিটারে জাস্টিফাই করবেন সেটা পরের ব‍্যাপার\"।

শিক্ষামন্ত্রীর মুখে এটা কোন ভাষা? না বাংলা, না ইংরেজি। শিক্ষামন্ত্রী এভাবে কথা বলে কী দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাইলেন? তিনি কি বাংলা ভুলে গেছেন, না কি ইংরেজি শব্দ ব‍্যবহার না করলে তাঁর কথাগুলো মানুষ বুঝবেন না?

আচ্ছা দেখা যাক, কোনো জটিল ও অপ্রচলিত বাংলা শব্দ ব‍্যবহার না করে তাঁর কথাগুলো বিশুদ্ধ বাংলায় কীভাবে বলা যায়। কথাগুলো এরকম হতে পারতো— প্রশাসনিক ব‍্যাপার প্রশাসনিক উপায়েই হবে। বিষয়টি আমাদের ওপর ছেড়ে দিন। আমরাতো কাজ করছি। লটারী ভর্তি পদ্ধতির সমাধান নয়। একদমই না। আপনি মেধাকে কীভাবে মূল‍্যায়ণ (বা যাচাই, বা বিচার) করবেন সেটা পরের ব‍্যাপার।

— শিক্ষামন্ত্রী ইংরেজি ব‍্যবহার না করে কথাগুলো এভাবে বিশুদ্ধ বাংলায় বললে কি জনগণের বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হতো? নিশ্চয় নয়। এখানে একটিও তো জটিল বা অপ্রচলিত বাংলা শব্দ ব‍্যবহার করতে হয়নি। জনগণ এসব শব্দের সঙ্গে পরিচিত। নিশ্চয় তিনিও। তাহলে শিক্ষামন্ত্রী কেন তাঁর বক্তব‍্যে যথেচ্ছা ইংরেজী শব্দ ব‍্যবহার করলেন? এটা কি তাঁর ভাষাপ্রেমের অভাব, না কি নিজেকে উচ্চশিক্ষিত জাহির করার চেষ্টা?

দু\'জন সংসদ সদস‍্য— আন্দালিব রহমান পার্থ ও সালাউদ্দিন আহমেদ সংসদে কথা বলার সময় প্রায় পঞ্চাশ ভাগ কথাই ইংরেজীতে বলেন। কখনো পুরো বাক‍্য আবার কখনো বাংলার সঙ্গে একেবারে দরকার ছাড়া একটি ইংরেজি শব্দ ঢুকিয়ে দেন।

যেমন একটি ভিডিওতে দেখলাম আন্দালিব রহমান পার্থ বলছেন— \"আন্ডারমাইন দ‍্য প্রভিশন অব দ‍্য আদেশ। আমি কামিং টু দ‍্য পয়েন্ট। চারটা প্রভিশন যে দেওয়া আছে। আসুন সংবিধানটাকে রেসপেক্ট করি, জুলাই সনদটাকেও রেসপেক্ট করি\"।

কী হলো তাঁর এই কথা? এখানে আন্ডারমাইন কেন বলতে হবে? অবজ্ঞা বললে কি ক্ষতি হতো? প্রভিশন কেন বলতে হবে? নিয়ম বা বিধান বললে ক্ষতি কী? অব দ‍্য আদেশ— এটা কোন ভাষা? আমি কামিং টু দ‍্য পয়েণ্ট। ভাষার এই মিশ্রণটা কতটা দরকারী ছিল? আমি মূল প্রসঙ্গে আসছি বললেই তো যথেষ্ট ছিল। আবার তিনি বললেন— আসুন সংবিধানকে রেসপেক্ট করি। অথচ রিসপেক্ট শব্দের কী সুন্দর বাংলাই না রয়েছে— শ্রদ্ধা। উনি বলতে পারতেন আসুন সংবিধানকে শ্রদ্ধা করি। সংসদ সদস‍্য একদিকে বলছেন সংবিধানকে \' রেসপেক্ট\' করার জন‍্য, অথচ নিজে মাতৃভাষাটাকেই \' রেসপেক্ট\' করছেন না। বিষয়টি কি স্ববিরোধী নয়?

জাতীয় সংসদে এ ধরণের মিশ্র ভাষার ব‍্যবহার কিছুতেই গ্রহণযোগ‍্য হতে পারে না। এতে ভাষার সৌন্দর্যহানি হয়। উদাহরণ দিলে ভুরি ভুরি দেওয়া যাবে। সংসদের অধিবেশনগুলো দেখলেই এর প্রমাণ মিলবে। একজন নাগরিক হিসেবে স্পীকার ও সংসদ সদস‍্যদেরকে বিনীতভাবে বলতে চাই— আপনারা এ দেশের সাধারণ জনগণের প্রতিনিধি। তাই জাতীয় সংসদে ইংরেজিতে নয়, এলিটদের ভাষায় নয়, জনগণের ভাষায় কথা বলুন। বাংলার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করুন। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করুন। এটা আপনাদের পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়, এটা আপনাদের নৈতিক দায়িত্ব।

স্পীকার ও সংসদ সদস‍্যদের মনে রাখা উচিত যে তাঁরা প্রতিনিধিত্ব করেন দেশের মানুষকে। সুতরাং তাঁদের ভাষাও হওয়া উচিত জনগণের ভাষা। নিজেরা ইংরেজি জানেন বলে কথায় কথায় ইংরেজি ঝাড়ার জায়গা সংসদ নয়, সেটা ব‍্যক্তিগত পরিসরে করতে পারেন। তাই এমন একটা বিধান করা জরুরি যে স্পীকার ও সংসদ সদস‍্যরা অপ্রয়োজনে সংসদে ইংরেজি শব্দ ব‍্যবহার করতে পারবেন না। সংসদের ভাষা হবে বাংলা। যেসব শব্দের বাংলা পরিভাষা নেই সেসব শব্দের কথা ভিন্ন। যেসব শব্দকে বাংলায় আত্তীকরণ করা হয়েছে সেসব শব্দ অবশ‍্যই ব‍্যবহার করা যাবে। তাই বলে পারিবারিক পরিবেশে, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে নিজেদের খেয়ালখুশী মতো যেভাবে বাংলার সঙ্গে ইংরেজি মিশিয়ে আমরা কথা বলি, জাতীয় সংসদের মতো দেশের একটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে দাঁড়িয়ে সেভাবে, অর্থাৎ যেটাকে অনেকে বলে \'বাংলিশ\' ভাষায় কথা বলা ঠিক নয়। এতে একদিকে যেমন ভাষার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয়, অপরদিকে ভাষা শহীদদের প্রতিও অসম্মান জানানো হয়। জনগণ নিশ্চয় জাতীয় সংসদে জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে তা আশা করেন না!

সারওয়ার-ই আলম: ইলফোর্ড, লণ্ডন, ১ এপ্রিল ২০২৬
img

সাংবাদিক রাষ্ট্রের কর্মচারী নন

প্রকাশিত :  ১১:০০, ০৬ জুন ২০২৬

আবদুল হামিদ মাহবুব

সম্প্রতি বরগুনা জেলা প্রশাসনের একটি চিঠি সাংবাদিক মহলে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। চিঠিতে জেলার কর্মরত সাংবাদিকদের প্রতি মাসের প্রথম রবিবার জেলা প্রশাসকের কাছে জেলার বিভিন্ন সমস্যা, অনিয়ম, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হয়েছে। নির্দেশটি জেলা প্রশাসকের। আর চিঠি ইস্যু করেছেন একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র মোঃ সোহেল রেজা। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বরগুনা জেলা প্রশাসনের জারিকৃত চিঠির বিষয় নিয়ে ইতোমধ্যে একটি তথ্যবহুল আলোচনা লিখেছেন। যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার সাথে যুক্ত,  এরা হয়তো সেটা দেখেছেন। আমি এখানে সাংবাদিকতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিছু কথা তুলে ধরছি সকল পাঠকের জানার জন্য। পাশাপাশি আমাদের সাংবাদিক বন্ধুদেরও বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

বরগুনা জেলা প্রশাসনের চিঠিটি দেখে অনেকের কাছে প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, প্রশাসন ও গণমাধ্যমের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির একটি উদ্যোগ এটি। কিন্তু বিষয়টি গভীরভাবে ভাবলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। সাংবাদিক কি প্রশাসনের কাছে নিয়মিত রিপোর্ট দেওয়ার মানুষ? সাংবাদিক কি প্রশাসনের অনানুষ্ঠানিক তথ্য সংগ্রহকারী? নাকি তাঁর প্রধান দায়িত্ব জনগণের পক্ষে দাঁড়ানো এবং ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনা?

সাংবাদিকতার মূল দর্শন বলছে, সংবাদমাধ্যমের জন্ম হয়েছে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার জন্য। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের বাইরে এটি একটি স্বাধীন সামাজিক শক্তি। এর প্রধান কাজ হলো জনস্বার্থ রক্ষা করা, দুর্নীতি ও অনিয়ম তুলে ধরা এবং ক্ষমতার ব্যবহার সম্পর্কে জনগণকে সচেতন রাখা।

সাংবাদিকতার আন্তর্জাতিক নীতিমালায় বারবার বলা হয়েছে, সাংবাদিকের প্রথম দায়িত্ব সত্যের প্রতি এবং তাঁর প্রথম আনুগত্য জনগণের প্রতি। কারণ সাংবাদিক কোনো সরকারি কর্মকর্তা নন। তিনি জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কাজ করেন। তাঁর দায়িত্ব সত্য তথ্য সংগ্রহ করা, যাচাই করা এবং জনগণের সামনে তুলে ধরা।

গণমাধ্যমকে দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার একটি স্বাধীন ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়। এই স্বাধীনতাই সংবাদমাধ্যমের শক্তি। যদি সংবাদমাধ্যম প্রশাসনিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয় বা সে রকম ধারণা তৈরি হয়, তাহলে তার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সংবাদমাধ্যমের অন্যতম প্রধান ভূমিকা হলো প্রহরীর ভূমিকা পালন করা। অর্থাৎ ক্ষমতা কোথায় কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, কোথাও অনিয়ম হচ্ছে কি না, জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না; এসব বিষয়ে নজর রাখা। একজন সাংবাদিকের কাজ হচ্ছে পর্যবেক্ষণ করা, প্রশ্ন তোলা এবং তথ্য প্রকাশ করা। প্রশাসনের কাছে নিয়মিত প্রতিবেদন জমা দেওয়া নয়।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা আচরণবিধিতেও সাংবাদিকের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ, সত্য ও নির্ভুল সংবাদ পরিবেশন এবং তথ্য যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে। কোথাও বলা নেই যে সাংবাদিকরা কোনো সরকারি কর্মকর্তার কাছে নিয়মিত প্রশাসনিক রিপোর্ট জমা দেবেন। এ কারণেই বরগুনা জেলা প্রশাসনের চিঠিটি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যে সাংবাদিক প্রশাসনের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করবেন, তিনি যদি একই সঙ্গে প্রশাসনের কাছে নিয়মিত প্রতিবেদনও দেন, তাহলে তাঁর স্বাধীন অবস্থান কোথায় থাকবে?

রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ ও তদারকি ব্যবস্থা রয়েছে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করে। ফলে জেলার পরিস্থিতি জানার জন্য সাংবাদিকদের প্রশাসনিক রিপোর্টদাতা হিসেবে দেখার প্রয়োজনীয়তা কতটা যৌক্তিক, সেটি ভেবে দেখার বিষয়।

এ ধরনের উদ্যোগ থেকে কয়েকটি বাস্তব সমস্যা তৈরি হতে পারে। আমার বিবেচনায় সেগুলো হচ্ছে, সাধারণ মানুষের কাছে সাংবাদিকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, তথ্যদাতা বা অনিয়ম সম্পর্কে অবহিত ব্যক্তিরা সাংবাদিকের কাছে তথ্য দিতে দ্বিধা করতে পারেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কারণ প্রশাসনের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক রিপোর্টিং সম্পর্ক সাংবাদিককে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলতে পারে এবং পেশাগত স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তবে এটাও সত্য যে জেলা প্রশাসনের উদ্দেশ্য হয়তো জনস্বার্থে তথ্য সংগ্রহ করা। কিন্তু গণতান্ত্রিক সমাজে শুধু উদ্দেশ্য নয়, পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসন চাইলে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করতে পারে, সংবাদ সম্মেলন করতে পারে, বিভিন্ন বিষয়ে মতামত নিতে পারে কিংবা জনগণের সমস্যা নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা আয়োজন করতে পারে। এসব উদ্যোগ গণতান্ত্রিক ও ইতিবাচক। কিন্তু সাংবাদিকদের কাছ থেকে নিয়মিত প্রশাসনিক প্রতিবেদন আহ্বান করা সাংবাদিকতার স্বাধীন ভূমিকা সম্পর্কে একটি ভুল ধারণার প্রতিফলন বলে মনে হয়।

প্রশাসনের উপলব্ধি করা দরকার, সাংবাদিক রাষ্ট্রের শত্রু নন, আবার রাষ্ট্রের কর্মচারীও নন। তিনি জনগণ ও রাষ্ট্রের মধ্যে জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। একজন স্বাধীন সাংবাদিক অনেক সময় ক্ষমতাসীনদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারেন, কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য তিনি অপরিহার্য। কারণ স্বাধীন সাংবাদিকতাই অনিয়ম উন্মোচন করে, দুর্নীতি প্রকাশ করে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে।

বরগুনা জেলা প্রশাসনের চিঠিটি হয়তো সদিচ্ছা থেকেই জারি করা হয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তার আলোকে এটি একটি বিতর্কিত বার্তা বহন করে। সাংবাদিককে প্রশাসনের মাসিক রিপোর্টদাতায় পরিণত করা যায় না।

সাংবাদিক জনগণের প্রতিনিধি। তাঁর কাজ জনগণের পক্ষে সত্য তুলে ধরা, ক্ষমতার ওপর নজর রাখা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। প্রশাসন ও গণমাধ্যম; উভয়ই রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তবে তাদের ভূমিকা এক নয়। সেই ভিন্নতাকে সম্মান করাই একটি পরিণত গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব।
মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪, ই-মেইল:  [email protected]

মতামত এর আরও খবর