img

সাংবাদিক রাষ্ট্রের কর্মচারী নন

প্রকাশিত :  ১১:০০, ০৬ জুন ২০২৬

সাংবাদিক রাষ্ট্রের কর্মচারী নন

আবদুল হামিদ মাহবুব

সম্প্রতি বরগুনা জেলা প্রশাসনের একটি চিঠি সাংবাদিক মহলে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। চিঠিতে জেলার কর্মরত সাংবাদিকদের প্রতি মাসের প্রথম রবিবার জেলা প্রশাসকের কাছে জেলার বিভিন্ন সমস্যা, অনিয়ম, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হয়েছে। নির্দেশটি জেলা প্রশাসকের। আর চিঠি ইস্যু করেছেন একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র মোঃ সোহেল রেজা। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বরগুনা জেলা প্রশাসনের জারিকৃত চিঠির বিষয় নিয়ে ইতোমধ্যে একটি তথ্যবহুল আলোচনা লিখেছেন। যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার সাথে যুক্ত,  এরা হয়তো সেটা দেখেছেন। আমি এখানে সাংবাদিকতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিছু কথা তুলে ধরছি সকল পাঠকের জানার জন্য। পাশাপাশি আমাদের সাংবাদিক বন্ধুদেরও বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

বরগুনা জেলা প্রশাসনের চিঠিটি দেখে অনেকের কাছে প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, প্রশাসন ও গণমাধ্যমের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির একটি উদ্যোগ এটি। কিন্তু বিষয়টি গভীরভাবে ভাবলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। সাংবাদিক কি প্রশাসনের কাছে নিয়মিত রিপোর্ট দেওয়ার মানুষ? সাংবাদিক কি প্রশাসনের অনানুষ্ঠানিক তথ্য সংগ্রহকারী? নাকি তাঁর প্রধান দায়িত্ব জনগণের পক্ষে দাঁড়ানো এবং ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনা?

সাংবাদিকতার মূল দর্শন বলছে, সংবাদমাধ্যমের জন্ম হয়েছে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার জন্য। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের বাইরে এটি একটি স্বাধীন সামাজিক শক্তি। এর প্রধান কাজ হলো জনস্বার্থ রক্ষা করা, দুর্নীতি ও অনিয়ম তুলে ধরা এবং ক্ষমতার ব্যবহার সম্পর্কে জনগণকে সচেতন রাখা।

সাংবাদিকতার আন্তর্জাতিক নীতিমালায় বারবার বলা হয়েছে, সাংবাদিকের প্রথম দায়িত্ব সত্যের প্রতি এবং তাঁর প্রথম আনুগত্য জনগণের প্রতি। কারণ সাংবাদিক কোনো সরকারি কর্মকর্তা নন। তিনি জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কাজ করেন। তাঁর দায়িত্ব সত্য তথ্য সংগ্রহ করা, যাচাই করা এবং জনগণের সামনে তুলে ধরা।

গণমাধ্যমকে দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার একটি স্বাধীন ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়। এই স্বাধীনতাই সংবাদমাধ্যমের শক্তি। যদি সংবাদমাধ্যম প্রশাসনিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয় বা সে রকম ধারণা তৈরি হয়, তাহলে তার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সংবাদমাধ্যমের অন্যতম প্রধান ভূমিকা হলো প্রহরীর ভূমিকা পালন করা। অর্থাৎ ক্ষমতা কোথায় কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, কোথাও অনিয়ম হচ্ছে কি না, জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না; এসব বিষয়ে নজর রাখা। একজন সাংবাদিকের কাজ হচ্ছে পর্যবেক্ষণ করা, প্রশ্ন তোলা এবং তথ্য প্রকাশ করা। প্রশাসনের কাছে নিয়মিত প্রতিবেদন জমা দেওয়া নয়।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা আচরণবিধিতেও সাংবাদিকের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ, সত্য ও নির্ভুল সংবাদ পরিবেশন এবং তথ্য যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে। কোথাও বলা নেই যে সাংবাদিকরা কোনো সরকারি কর্মকর্তার কাছে নিয়মিত প্রশাসনিক রিপোর্ট জমা দেবেন। এ কারণেই বরগুনা জেলা প্রশাসনের চিঠিটি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যে সাংবাদিক প্রশাসনের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করবেন, তিনি যদি একই সঙ্গে প্রশাসনের কাছে নিয়মিত প্রতিবেদনও দেন, তাহলে তাঁর স্বাধীন অবস্থান কোথায় থাকবে?

রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ ও তদারকি ব্যবস্থা রয়েছে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করে। ফলে জেলার পরিস্থিতি জানার জন্য সাংবাদিকদের প্রশাসনিক রিপোর্টদাতা হিসেবে দেখার প্রয়োজনীয়তা কতটা যৌক্তিক, সেটি ভেবে দেখার বিষয়।

এ ধরনের উদ্যোগ থেকে কয়েকটি বাস্তব সমস্যা তৈরি হতে পারে। আমার বিবেচনায় সেগুলো হচ্ছে, সাধারণ মানুষের কাছে সাংবাদিকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, তথ্যদাতা বা অনিয়ম সম্পর্কে অবহিত ব্যক্তিরা সাংবাদিকের কাছে তথ্য দিতে দ্বিধা করতে পারেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কারণ প্রশাসনের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক রিপোর্টিং সম্পর্ক সাংবাদিককে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলতে পারে এবং পেশাগত স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তবে এটাও সত্য যে জেলা প্রশাসনের উদ্দেশ্য হয়তো জনস্বার্থে তথ্য সংগ্রহ করা। কিন্তু গণতান্ত্রিক সমাজে শুধু উদ্দেশ্য নয়, পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসন চাইলে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করতে পারে, সংবাদ সম্মেলন করতে পারে, বিভিন্ন বিষয়ে মতামত নিতে পারে কিংবা জনগণের সমস্যা নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা আয়োজন করতে পারে। এসব উদ্যোগ গণতান্ত্রিক ও ইতিবাচক। কিন্তু সাংবাদিকদের কাছ থেকে নিয়মিত প্রশাসনিক প্রতিবেদন আহ্বান করা সাংবাদিকতার স্বাধীন ভূমিকা সম্পর্কে একটি ভুল ধারণার প্রতিফলন বলে মনে হয়।

প্রশাসনের উপলব্ধি করা দরকার, সাংবাদিক রাষ্ট্রের শত্রু নন, আবার রাষ্ট্রের কর্মচারীও নন। তিনি জনগণ ও রাষ্ট্রের মধ্যে জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। একজন স্বাধীন সাংবাদিক অনেক সময় ক্ষমতাসীনদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারেন, কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য তিনি অপরিহার্য। কারণ স্বাধীন সাংবাদিকতাই অনিয়ম উন্মোচন করে, দুর্নীতি প্রকাশ করে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে।

বরগুনা জেলা প্রশাসনের চিঠিটি হয়তো সদিচ্ছা থেকেই জারি করা হয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তার আলোকে এটি একটি বিতর্কিত বার্তা বহন করে। সাংবাদিককে প্রশাসনের মাসিক রিপোর্টদাতায় পরিণত করা যায় না।

সাংবাদিক জনগণের প্রতিনিধি। তাঁর কাজ জনগণের পক্ষে সত্য তুলে ধরা, ক্ষমতার ওপর নজর রাখা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। প্রশাসন ও গণমাধ্যম; উভয়ই রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তবে তাদের ভূমিকা এক নয়। সেই ভিন্নতাকে সম্মান করাই একটি পরিণত গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব।
মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪, ই-মেইল:  [email protected]
img

তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু: আমার কিছু অনুভূতির প্রকাশ

প্রকাশিত :  ০৬:১৪, ০৩ জুন ২০২৬

আবদুল হামিদ মাহবুব

মৃত্যু মানুষের জীবনের শেষ অধ্যায়। কিন্তু অনেক সময় মৃত্যুর পরই একজন মানুষকে নিয়ে নতুন বিতর্কের শুরু হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন ঘটনা নতুন নয়। বরং দিন দিন এটি যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। সম্প্রতি তোফায়েল আহমদের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেল, সেটিও সেই পুরোনো বাস্তবতারই নতুন সংস্করণ।

কেউ শোক প্রকাশ করেছেন। কেউ তার রাজনৈতিক জীবনের নানা সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আবার কেউ এমন ভাষায় সমালোচনা করেছেন, যা একজন মৃত মানুষকে নিয়ে সভ্য সমাজে প্রত্যাশিত নয়।

একজন মানুষ মারা যাওয়ার পর আমরা আসলে কী বিচার করি? তার পুরো জীবনকে, নাকি জীবনের শেষ কয়েকটি অধ্যায়কে? এইসব প্রশ্ন আমি কাকে করছি? করছি নিজেকে। নিজের বিবেককে। উত্তরটা আমাকেই দিতে হবে। আমার কাছে উত্তরগুলো এমন; মানুষ ভুল করে। ভুল-শুদ্ধ নিয়েই মানুষের জীবন। পৃথিবীর কোনো রাজনীতিবিদের জীবনই সম্পূর্ণ নির্ভুল নয়। বিশেষ করে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে রাজনীতি অনেক বেশি সংঘাতপূর্ণ। এখানে সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ক্ষমতা, আন্দোলন, দলীয় বাস্তবতা, রাষ্ট্রের চাপ এবং সময়ের দাবি। ফলে রাজনৈতিক জীবনে ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকে।

তবে একটি বিষয়ও সত্য। একজন মানুষের জীবনের মূল্যায়ন করতে হলে তার অবদান, প্রেক্ষাপট এবং সময়কে একসঙ্গে দেখতে হয়। শুধু পছন্দ বা অপছন্দের ভিত্তিতে ইতিহাস লেখা যায় না। আমি এখানে ইতিহাসও লিখছি না। আমি কেবল তোফায়েল আহমদকে নিয়ে কিছু মনের কথা তুলে ধরছি।

তোফায়েল আহমদ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি শুধু একজন মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য ছিলেন না। তিনি ছিলেন ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ। সেই সময়ের ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে তার নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হয়। ওই সময়ের দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি ছিলেন।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে একটি বড় বাঁক। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, সেই আন্দোলনই পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের পথ তৈরি করেছিল। পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে ছাত্রসমাজের যে ভূমিকা ছিল, সেখানে তোফায়েল আহমদ ছিলেন সামনের সারির একজন সংগঠক।

স্বাধীনতার আগে তার ভূমিকা নিয়ে খুব বেশি বিতর্ক নেই। বিতর্ক আছে স্বাধীনতার পরের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে। কিন্তু এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। আমরা প্রায়ই একজন মানুষের পুরো জীবনকে একটি মাত্র ঘটনার মধ্যে আটকে ফেলি। আবার কখনো একটি ভুল দিয়ে সব অর্জন মুছে ফেলতে চাই। অন্যদিকে একটি ভালো কাজ দিয়ে সব ভুলও ক্ষমা করে দিতে চাই। দুটিই চরমপন্থা।

একজন মানুষ একই সঙ্গে অবদানও রাখতে পারেন, আবার ভুলও করতে পারেন। ইতিহাসের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ মানুষই এমন। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আরেকটি বড় সংকট হলো প্রতিপক্ষকে অস্বীকার করার প্রবণতা। এখানে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক সময় ব্যক্তিগত শত্রুতায় রূপ নেয়। ফলে মৃত্যুর পরও বিরোধ শেষ হয় না।

বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকে। তীব্র মতভেদও থাকে। কিন্তু একজন মানুষ মারা গেলে তার অবদানকে সম্মান করার একটি সংস্কৃতি রয়েছে। সমালোচনা তখনও হয়, কিন্তু তা হয় তথ্যের ভিত্তিতে, শালীন ভাষায়। বাংলাদেশে আমরা এখনো সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারিনি।

এর একটি কারণ গণতান্ত্রিক চর্চার দুর্বলতা। স্বাধীনতার ৫৫ বছরেরও বেশি সময় পরও আমরা গণতন্ত্রকে পুরোপুরি একটি সংস্কৃতিতে রূপ দিতে পারিনি। নির্বাচন হয়েছে। সরকার বদল হয়েছে। আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু সহনশীলতা খুব বেশি গড়ে ওঠেনি। ফলে রাজনৈতিক মতভেদকে আমরা প্রায়ই ব্যক্তিগত বিদ্বেষে পরিণত করি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও দৃশ্যমান করেছে। আগে কোনো মন্তব্য একটি নির্দিষ্ট আড্ডা বা পরিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। এখন একটি পোস্ট কয়েক মিনিটেই হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তথ্যের সঙ্গে গুজবও ছড়ায়। সত্যের সঙ্গে মিথ্যাও হাঁটে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আমরা অনেক সময় যাচাই করার প্রয়োজনও অনুভব করি না। একটি পোস্ট দেখলাম। সেটি আমাদের পছন্দ হলো। সঙ্গে সঙ্গে শেয়ার করে দিলাম। যেন তথ্য নয়, অনুভূতিই সত্যের একমাত্র মানদণ্ড। ফলে একজন মৃত মানুষকে নিয়েও অসংখ্য অপপ্রচার ছড়িয়ে পড়ে।

তোফায়েল আহমদের মৃত্যুর ঘটনাটি আবারও আমাদের সামনে সেই প্রশ্ন তুলেছে; আমরা কি ইতিহাসকে পড়ছি, নাকি শুধু প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি?

একজন রাজনৈতিক নেতার সমালোচনা অবশ্যই করা যাবে। গণতন্ত্রে সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু সমালোচনা আর কুৎসা এক জিনিস নয়। মতভেদ আর বিদ্বেষও এক নয়। একজন মানুষকে মূল্যায়ন করতে হলে তার জীবনকে সম্পূর্ণ দেখতে হবে। কোথায় তিনি সফল ছিলেন, কোথায় ব্যর্থ ছিলেন, কী অবদান রেখেছেন, কী ভুল করেছেন—সবকিছুই আলোচনায় আসতে পারে। কিন্তু সেটি হতে হবে তথ্যের ভিত্তিতে।

কারণ ইতিহাস প্রতিশোধের জায়গা নয়। ইতিহাস বিচার করে সময়, প্রেক্ষাপট এবং কাজকে। আজ তোফায়েল আহমদ নেই। তার রাজনৈতিক জীবনের বিতর্কও থাকবে। সমর্থকরা তার অর্জনের কথা বলবেন। সমালোচকরা তার সীমাবদ্ধতার কথা তুলবেন। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের ইতিহাসে তার একটি অধ্যায় রয়েছে। সেই অধ্যায় মুছে ফেলা যাবে না। যেমন তার রাজনৈতিক জীবনের বিতর্কও মুছে ফেলা যাবে না।

সভ্য সমাজের বৈশিষ্ট্য হলো, তারা মানুষকে সাদা বা কালো রঙে দেখে না। তারা দেখে পূর্ণ মানুষ হিসেবে। গুণ ও সীমাবদ্ধতার সমন্বয়ে। আমাদেরও সেই শিক্ষা দরকার। কারণ আজ আমরা তোফায়েল আহমদকে নিয়ে কথা বলছি। কাল অন্য কাউকে নিয়ে বলব। একদিন আমাদের নিজেদের জীবনও অন্যরা মূল্যায়ন করবে।

সেদিন আমরা কী চাইব? আমাদের ভুলগুলোই শুধু মনে রাখা হোক, নাকি আমাদের ভালো কাজগুলোকেও স্মরণ করা হোক? এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো বলে দেবে আমরা কতটা সভ্য হয়েছি।

তোফায়েল আহমদের মৃত্যু তাই শুধু একজন রাজনীতিকের বিদায় নয়। এটি আমাদের সমাজের সামনে ধরা একটি আয়না। সেই আয়নায় আমরা একজন মানুষকে যতটা দেখি, তার চেয়েও বেশি দেখি নিজেদের। প্রশ্ন এখন একটাই; আমরা কি সেই আয়নায় তাকানোর সাহস রাখি?


লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব।
মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪
ই-মেইল:  [email protected]

মতামত এর আরও খবর