বৈশাখে পান্তা-ইলিশ যেভাবে এলো
আবদুল হামিদ মাহবুব
বাংলা নববর্ষের (পহেলা বৈশাখ) প্রথম দিনে সকল বাঙালির ঘরেই যার যার সাধ্যমত ভালো-মন্দ খাওয়ার একটা রেওয়াজ চালু ছিল। কিন্তু সেই রেওয়াজ পান্তা-ইলিশে গড়ালো কিভাবে? প্রশ্নটা অনেকের মাথায় আসে। কিন্তু ঘটনা ক্রমে আমি ‘আবদুল হামিদ মাহবুব’ সেই কাহিনী কিছুটা জানি।
পান্তা-ইলিশের প্রচলনটা শুরু হয়েছে, ঢাকার বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। আমি তখন পত্রিকার কাজে ঢাকায় ছিলাম। মাসটা ছিল এপ্রিল। সম্ভবত ১৯৮২ অথবা ১৯৮৩ সাল। দৈনিক দেশ-এ আমি কাজ করতাম ‘মৌলভীবাজারের নিজস্ব সংবাদদাতা’ হিসেবে। আমার সাথে সখ্যতা ছিল দৈনিক দেশ-এর মফস্বলের দায়িত্বে থাকা আবু সাঈদ জুবেরীর। মফস্বলে আরেকজন কাজ করতেন। উনার নামের সাথে নজরুল ছিল। এতো বছর পর উনার পুরো নামটা ভুলে গেছি। সম্ভবত: সানাউল্লাহ নূরী ছিলেন পত্রিকার সম্পাদক। বার্তা সম্পাদক বোরহান আহমেদ। সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন কবি হেলাল হাফিজ।
পত্রিকার মালিক ছিলেন এরশাদের মন্ত্রী মাইদুল ইসলাম। বোরহান আহমদ, হেলাল হাফিজ ও রোজী ফেরদৌসী একটা রুমে বসতেন। রোজী ফেরদৌসী পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করতেন। সম্ভবত শিশু পাতাটাও তিনি দেখতে। আমার অনেক ছড়া শিশু পাতায় ছাপা হয়েছে।
এই তিনজন বসতেন সেই সেগুনবাগিচার বাসার মতো বানানো পুরনো বিল্ডিংয়ে ঢোকার হাতের বাম পাশের প্রথম রুমটায়। সেগুনবাগিচার সেই ভবন ও ভূমি ছিল সরকারের পরিত্যক্ত সম্পত্তি। কাঠের সিঁড়ি ভেঙ্গে দোতালায় উঠতে হতো। ওখানে একটি রুমে সম্পাদক বসতেন। সাপ্তাহিক বিপ্লব নামে একটি ম্যাগাজিন বের হতো। ওইটার সম্পাদক ছিলেন কবি সিকদার আমিনুল হক। তিনিও দোতলার একটি রুমে বসতেন। ক্ষমতার জোরে মাইদুল ইসলাম সে বাড়ি ও ভূমি দখল করে রেখেছিলেন। ‘দৈনিক দেশ’ প্রকাশনা বন্ধ হওয়ার বেশ পরে সেই সম্পত্তিতেই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কার্যক্রম শুরু হয়েছিলো। জাদুঘর দেখতে আমি কয়েকবার ওখানে গিয়েছি।
তো যে কথা বলছিলাম, সম্ভবত হেলাল হাফিজের সাথে কথা বলতেই আমি বোরহান আহমেদের ওই রুমে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখলাম বোরহান ভাই কথা বলছেন রোজী ফেরদৌসীর সাথে। বিষয় সামনে পহেলা বৈশাখ। সেই বৈশাখের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রমনা পার্কের অনুষ্ঠান স্থলের বটতলে হাজার হাজার মানুষ সমাগম হয়। বোরহান আহমেদ প্রস্তাব করলেন ওখানে একটি পান্তা ভাতের দোকান দিলে ভালো ব্যবসা হবে। বিষয়টি লুফে নিলেন রোজী ফেরদৌসী। জিন্সের টাইট প্যান্ট পরা গায়েও জিন্সের শার্ট কবি হেলাল হাফিজ সবসময়ই একটু গম্ভীর থাকতেন। খুব একটা কথা বলতেন না। তার টান থাকতো প্রেসক্লাবের প্রতি। তিনি হাতের কাজ সেরেই কিভাবে প্রেসক্লাবে চলে যাবেন সেই চিন্তায় যেনো একটা ঘোরের মধ্যে থাকতেন। প্রেসক্লাবর প্রতি টান থাকার কারণ, ওখানে গিয়ে তিনি জুয়া খেলতেন। কিন্তু তিনিও ওই আলোচনায় ঢুকে গেলেন। তিনি বললেন পান্তা ভাতের সাথে ইলিশ ভাজি রাখলে আরো ভালো হবে। একজন হাবাগোবা মফস্বলের মানুষ হিসেবে তাদের সকল কথা শুনেই গেছি। হেলাল হাফিজের টেবিলের সামনে একটিভ চেয়ারে বসে থেকে তাদের পরিকল্পনাগুলো শুনছিলাম, আর শুনছিলাম। পেয়াজ, কাঁচা মরিচ, ভর্তা আরো কি কি তারা বলছিলেন!
কথা বাড়তে বাড়তে এক সময় সিদ্ধান্ত হয়ে গেলো। পান্তাভাতের একটি দোকান দেওয়াই হবে। সাথে থাকবে ইলিশ ভাজা। পান্তাভাত বানানোর দায়িত্ব পড়লো রোজী ফেরদৌসীর উপর। ইলিশ কেনার দায়িত্ব নিলেন বোরহান আহমেদ। সেই ঘটনার সাক্ষী থেকে গেলাম আমি, মফস্বলের একজন সাংবাদিক। শেষ পর্যন্ত রোজী ফেরদৌসী এই কর্মের সাথে যুক্ত ছিলেন কিনা আমি বলতে পারব না।
আমি এই পর্যন্ত তাদের কথাবার্তা শুনে ওখান থেকে চলে এসেছিলাম। মফস্বল বিভাগে এসে জুবেরী ভাইয়ের সাথে টুকটাক কথা সেরে চলে আসলাম। সেই বৈশাখে পান্তা স্টলের ছবিসহ রিপোর্টও এক দুটি পত্রিকায় বেরিয়েছিলো।
নোট: পুরোটাই স্মৃতি থেকে লিখেছি। একটু এদিক-সেদিক হতে পারে। তবে নিশ্চিত করছি, কাহিনী ঠিক আছে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব। সাংবাদিকতা বিষয়ক প্রকাশিত গ্রন্থ: ‘গণমাধ্যম সাংবাদিকতা দেশ দশের আমার কথা’।



















