img

মেটাস্ট্যাটিক ক্যান্সার : এক বিভীষিকার নাম

প্রকাশিত :  ১৬:০৮, ২৮ আগষ্ট ২০১৮

মেটাস্ট্যাটিক ক্যান্সার : এক বিভীষিকার নাম

বলিউডের এক সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী সোনালি বেন্দ্রে ক্যান্সারে আক্রান্ত এই খবর এখন কমবেশি সবার জানা। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে দুরারোগ্য মেটাস্ট্যাটিক ক্যান্সারে ভুগছেন এই অভিনেত্রী। মানব শরীরের জন্য ক্যান্সার বরারবরই এক বিভীষিকার নাম। আর ক্যান্সার যদি হয় মেটাস্ট্যাটিক তবে তো কথাই নেয়, অধিকাংশ সময়েই এই জটিল রোগ থেকে মুক্তির উপায় নেই। 

মেটাস্ট্যাটিক ক্যান্সার বৃত্তান্ত
মেটাস্ট্যাটিক ক্যান্সারকে সহজ ভাষায় অ্যাডভান্সড লেভেলের ক্যান্সার বলা যায়। তাই এই ক্যান্সারের নাম শুনলেই বুঝতে হবে শরীরে বাসা বাঁধা রোগটা ইতিমধ্যে প্রাথমিক পর্যায় শেষ করে সর্বোচ্চ তীব্রতা ধারণ করেছে। মেডিকেল টার্ম অনুযায়ী এই ক্যান্সার অধিকাংশ সময়ে শরীরের একস্থান থেকে অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত শরীরের রক্ত এবং লসিকার মাধ্যমেই তা ঘটে। এই যেমন- কারো লাংস ক্যান্সার যদি স্তনে ছড়ায় তবে বুঝতে হবে ক্যান্সার ইতিমধ্যে মেটাস্ট্যাটিক স্তরে চলে এসেছে। চিকিৎসক এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা তাই মেটাস্ট্যাটিক ক্যান্সারকে স্টেজ-৪ লেভেলের হিসেবে আখ্যায়িত করেন। টাইপ যেমনই হোক না কেন, যে-কোনো ক্যান্সারই চতুর্থ পর্যায়ে এসে মেটাস্ট্যাটিক আকারে পরিণত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ধরনের ক্যান্সার নিরাময় সম্ভব নয়। তাছাড়া এই ধরনের ক্যান্সার উৎপত্তিস্থল থেকে শরীরের অন্যত্র ছড়ায় বলে ক্যান্সারের প্রাথমিক সূত্র খুঁজে পেতে ডাক্তারদের বেশ বেগ পেতে হয়। তবে একমাত্র আশার কথা হলো যে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে এই ক্যান্সার ছড়ানোর গতি মন্থর করে দেওয়া যায় এবং এই ক্যান্সার নিয়েই রোগীর লম্বা সময় বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকে। 
 

মেটাস্ট্যাটিক ক্যান্সারের লক্ষণ
মেটাস্ট্যাটিক ক্যান্সারে সব সময় স্পষ্ট লক্ষণ প্রকাশ পাবে এমন ভাবাটা ভুল। তবে মোটাদাগে বলতে গেলে নিম্নোক্ত উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে।

* মাথাব্যথা ও মাথাঘোরা বা চক্কর দেয়া;
* নানারকমের প্রদাহ;
* দৃষ্টি সমস্যা;
* বহুদিনের ব্যথা বা ফ্র্যাকচার;
* জন্ডিস অথবা তলপেটে প্রদাহ;
* শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা;
* চলাফেরায় সমস্যা;
* মানসিকভাবে দ্বিধায় থাকা।

উপরে বর্ণিত লক্ষণগুলো অন্য কোনো রোগের লক্ষণ হিসেবেও দেখা দিতে পারে। তাই শরীরে মেটাস্ট্যাটিক ক্যান্সারের পূর্বাভাস জানার জন্য আরও কিছু উপসর্গের উপস্থিতি নির্ধারণ করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে উপরোক্ত লক্ষণগুলো ছাড়াও এই ধরনের ক্যান্সার নির্দেশক সাতটি চিহ্ন রয়েছে। এই চিহ্ন বা উপসর্গগুলো হলোঃ

> হুট করে ওজন কমে যাওয়া;
> দীর্ঘদিন ধরে কফজনিত সমস্যা;
> স্বাভাবিক মলত্যাগে যেকোনো ধরনের পরিবর্তন;
> মুখ, মূত্র কিংবা পায়ুপথ দিয়ে রক্তঝরা;
> খাদ্য গলাধঃকরণে সমস্যা;
> জখম উপশম না হওয়া বা অনেক সময় লাগা;
> কোনো ধরনের প্রদাহ এবং তা নিয়মিত বেড়ে চলা। 

প্রতিকার
এই ভয়াবহ রোগ থেকে প্রতিকারের পথ বেশ দুর্গম। আগেই বলা হয়েছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ ধরনের ক্যান্সার একেবারে নিরাময় সম্ভব নয়। তবে ক্যান্সার ছড়ানোর গতি একেবারে মন্থর করে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিয়মমাফিক উপায়ে মেটাস্ট্যাটিক ক্যান্সারের চিকিৎসা করানো হয়। আর এই প্রক্রিয়া কতটুকু সফল হবে তা প্রাইমারি ক্যান্সারের উৎপত্তি স্থল, ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা এবং আক্রান্ত ব্যক্তির বয়সের উপর নির্ভর করে। প্রাথমিকভাবে বেশ কিছুদিন মেডিকেশনের পর আক্রান্ত ব্যক্তির সুস্থতার জন্য স্বাভাবিকভাবেই কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, হরমোন থেরাপি এমনকি সার্জারির ব্যবস্থা করতে হয়। 

সত্যিকার অর্থেই মেটাস্ট্যাটিক ক্যান্সার এক বিভীষিকা ছাড়া কিছু নয়। অভিনেত্রী সোনালি বেন্দ্রেসহ আক্রান্ত সকলেই এই জটিল ও ভয়াবহ রোগ থেকে মুক্তি পাক, এটাই কাম্য। 
 

img

একটানা নয়, দুই দফায় ঘুমানোর পরামর্শ

প্রকাশিত :  ১০:৩৫, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

আমরা সুস্থ থাকার আদর্শ মানদণ্ড হিসেবে টানা আট ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টাকেই ধ্রুব সত্য বলে মেনে নিয়েছি। তবে ইতিহাস ও বিজ্ঞানের গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, আমাদের পূর্বপুরুষদের ঘুমের ধরণ ছিল বর্তমানের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং বৈচিত্র্যময়।

‘বাইফ্যাসিক স্লিপ’ বা দ্বিখণ্ডিত ঘুমের অসংখ্য প্রমাণ মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় সাহিত্য থেকে শুরু করে ভিক্টোরিয়ান যুগের বিভিন্ন নথিতে পাওয়া যায়। ইতিহাসবিদ রজার একির্চ প্রায় ৫০০টিরও বেশি ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, শিল্প বিপ্লবের আগে মানুষ মূলত দুই দফায় ঘুমাতে অভ্যস্ত ছিল। এই প্রাচীন জীবনধারায় মানুষ সূর্যাস্তের পরপরই বিছানায় যেত এবং রাত ১০টা বা ১১টার দিকে তাদের ‘প্রথম ঘুম’ ভেঙে যেত।

প্রথম দফার এই ঘুম ভাঙার পর মানুষের জীবনে ‘ওয়াচিং’ বা জেগে থাকার একটি বিশেষ বিরতি আসত যা প্রায় ঘণ্টা দুয়েক স্থায়ী হতো। এই সময়টুকুতে মানুষ অলস বসে না থেকে ঘরের টুকটাক কাজ, পড়াশোনা, প্রতিবেশী বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গল্পগুজব এবং ধর্মীয় উপাসনা করত। মধ্যরাতের এই বিরতি শেষে তারা পুনরায় ‘দ্বিতীয় ঘুমে’ তলিয়ে যেত এবং সূর্যোদয় পর্যন্ত সেই বিশ্রাম চলত। 

বিজ্ঞানীদের মতে, কৃত্রিম আলোর অনুপস্থিতিতে মানুষের শরীর মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণকে ভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করত বলেই এমনটি হতো। নব্বইয়ের দশকে মনোবিজ্ঞানী টমাস ওয়্যারের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষকে দীর্ঘ সময় অন্ধকারে রাখা হলে তাদের শরীর প্রাকৃতিকভাবেই এই দ্বিখণ্ডিত ঘুমের প্যাটার্নে ফিরে যায়।

এই দুই ঘুমের মধ্যবর্তী সময়ে মানবদেহে ‘প্রোল্যাকটিন’ নামক এক ধরনের হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, যা মানুষকে মানসিকভাবে শান্ত এবং অত্যন্ত সৃজনশীল করে তোলে। আধুনিক যুগের অনেক অনিদ্রা বা ইনসোমনিয়ার রোগী আসলে এই প্রাচীন জৈবিক ঘড়ির প্যাটার্নেই আটকে আছেন, যা বর্তমানের যান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খায় না। 

সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরোপে রাস্তার আলোর প্রচলন এবং পরবর্তীকালে শিল্প বিপ্লবের ফলে কৃত্রিম আলোর বিস্তার মানুষের এই আদিম অভ্যাসকে বদলে দেয়। কফি পানের সংস্কৃতি এবং রাত জেগে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা ঘুমের সেই মধ্যবর্তী সৃজনশীল বিরতিটুকুকে চিরতরে হারিয়ে দেয়।

আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, আট ঘণ্টার টানা ঘুমের প্রথা আসলে একটি সমকালীন উদ্ভাবন যা অনেক সময় আমাদের ডিএনএ-তে থাকা আদিম অভ্যাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়। বিশেষ করে ছাত্র, গবেষক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বা সৃজনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য এই মধ্যবর্তী জেগে থাকার সময় বা ‘ওয়াচ’ অত্যন্ত ফলপ্রসূ হতে পারে। 

ইতিহাসের এই বাঁক আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিশ্রামের কোনো ধরাবাঁধা গাণিতিক নিয়ম নেই। বরং প্রকৃতির ছন্দের সঙ্গে শরীরকে মিলিয়ে নেওয়াই ছিল মানুষের প্রকৃত স্বভাব। এই আদিম জৈবিকতাকে যদি বর্তমানের সৃজনশীল কাজে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে তা আমাদের চিন্তাশক্তিকে আরও শাণিত করতে পারে।