img

সেহরি এবং ইফতার : যা খাবেন, যা খাবেন না

প্রকাশিত :  ১৩:০৫, ০১ মার্চ ২০২৫

সেহরি এবং ইফতার : যা খাবেন, যা খাবেন না

আমরা সবসময় যতটুকু খাবার খাই, রমজানের সময় সে পরিমাণ খাবার খেতে হবে। এর বেশি নয় আবার কমও নয়। তাহলেই পুরা রমজানে সুস্থ থাকা যাবে। রোজার সময় তিন বেলার খাবার হলো-ইফতার, সন্ধ্যারাতে ও সেহরি।

* ইফতার

রোজার প্রধান আকর্ষণই হলো ইফতার। সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষ ইফতারের আয়োজন করে। এ সময় অনেক বেশি খাবারের পদ থাকা উচিত নয়। তাহলে দেখা যাবে একটি ইফতারের প্লেটে সারা দিনের বরাদ্দকৃত ক্যালরি সবটাই চলে এসেছে। ইফতারের প্রধান অনুষঙ্গ শরবত। এ শরবত সারা দিনের পানির অভাব পূরণ করে ও ক্লান্তি দূর করে। বিভিন্ন উপাদান দিয়ে শরবত করা যায়। যেমন-ইসবগুলের ভূসি, তোকমা, সিয়াসিড, লেবু, তেঁতুল, বেল, দুধ, দই, ফলের রস ইত্যাদি। শরবতের পরিবর্তে ডাবের পানি খাওয়া যাবে। তবে কখনই কোমল পানীয় নয়। বৈচিত্র্য আনার জন্য একেক দিন একেক রকম শরবত তৈরি করা যায়।

ইফতারের খাবারগুলোর মধ্যে আছে-ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, কাবাব, চিকেন ফ্রাই, ডালপুরি, আলুপুরি, ডিমচপ, শাকের বড়া, দই বড়া, হালিম, পাকুড়া, চিড়া-দই, পাকা কলা, ঘুঘনি, খেজুর, তেহারি, ফ্রায়েড রাইস, নরম খিঁচুড়ি, মাছের চাপ ইত্যাদি। ইফতারের প্লেটে ছোলা-মুড়ি ছাড়া একটি বা দুটি তেলে ভাজা রাখলে ভালো হয়। বেশি বেশি তেলে ভাজা খাবার খেলে বদহজম, গ্যাস্ট্রাইটিস, ওজনাধিক্য, রক্তে চর্বির পরিমাণ বৃদ্ধি ইত্যাদি হতে পারে। এদিকে পেটে চর্বির স্তর বেশি থাকলে ক্ষুধা বেশি অনুভূত হয়। অর্থাৎ ইফতার ও সেহরিতে বেশি খাবার খেলে ক্ষুধার তীব্রতা বেড়ে যায়। তখন সারা দিন উপবাস করাটা কঠিন হয়ে পড়ে। ইফতারে কাঁচা ছোলা, আদা, পুদিনা পাতা ও লবণ দিয়ে মেখে খেলে কোলেস্টোরেল কমার সম্ভাবনা থাকে। এটা বেশ উপাদেয় এবং স্বাস্থ্যসম্মত। ইফতারের পরিমাণ হবে অন্য দিনের সকালের সমপরিমাণ। ইফতার হবে রুচিকর ও স্বাস্থ্যকর।

* সন্ধ্যারাতের খাবার

এ সময় হালকা খাবারই ভালো। তরকারিতে থাকবে হালকা মসলা। ডাল বাদ দিলে ক্ষতি নেই। এ সময়ের খাবারের পরিমাণ হবে অন্য দিনের রাতের খাবারের সমপরিমাণ।

* সেহরি

ইফতারের মতো খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলো সেহরির খাবার। তবে খুব বেশি পরিমাণে না খাওয়াই ভালো। আবার গুরুপাক খাবার খেলেও সারা দিনে সমস্যা হতে পারে। অনেকে আবার আলসেমির জন্য সেহরি একেবারে বাদ দেন অথবা খুব কম খেয়ে থাকেন। সবই খারাপ। এ সময় খেতে হবে-ভাত বা রুটি, মাছ/মাংস/ডিম, ডাল,সবজি, দুধ বা দই। ভাত-রুটি ছাড়াও খাওয়া যাবে পরাটা, পাউরুটি, টোস্ট, দুধ-সেমাই, দুধ+ভাত+কলা ইত্যাদি। সেহরির খাবার হবে অন্য দিনের দুপুরের খাবারের সমপরিমাণ। রমজানে কখনও বাসী খাবার খাওয়া উচিত নয়। পানিশূন্যতা রোধ করার জন্য পানির পরিমাণ সঠিক মাত্রায় রাখতে হবে।

* ডায়াবেটিস

ডায়াবেটিস থাকলে অনেকে রোজা রাখতে ভয় পান। ভাবেন হাইপোগ্লাইসেমিয়া হবে। আসলে অসুস্থতা নিয়েও রোজা রাখা সম্ভব। যদি নিয়ম-কানুন মেনে চলা হয় তাহলে সমস্যা হয় না। শরবত খেতে হলে-ডাবের পানি, লেবু, পানি মেশানো ফলের রস, তোকমা, ইসবগুলের ভূসি, সিয়াসিড। চিনি ছাড়া অথবা বিকল্প চিনি দিয়ে শরবত করে খাওয়া যাবে। লাচ্ছি-ঘোল খেলেও অসুবিধা নেই। ইফতারে মিষ্টি ছাড়া খাবারগুলো খেতে কোনো বাধা নেই। তবে মাত্রাতিরিক্ত খাওয়া চলবে না। বাদ দিতে হবে-চিনি, গুড়, গ্লুকোজ, মধু, পায়েস, দুধ-সেমাই, পুডিং, মিষ্টি দই, জিলাপি, তেলে ভাজা খাবার যত কম খাওয়া যায় তত ভালো। টক-মিষ্টি উভয় ধরনের ফল দিয়ে সালাদ ও রায়তা করে খাওয়া যাবে। ইফতার ও সেহরি এমন হবে যাতে রক্তে শর্করা বেড়ে না যায়। ডায়াবেটিস থাকলে কোনোবেলায় না খেয়ে থাকা যাবে না। এতে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হতে পারে। যদি ইফতারে দুধ বা দই খাওয়া হয়, তাহলে সেহরিতে দুধ বা দই না খাওয়াই ভালো।

* কিডনি ও ইউরিক অ্যাসিড

এ ধরনের সমস্যায় ডাল বাদ দিয়ে আটা-ময়দা-চালের গুঁড়া, আলু দিয়ে ইফতার তৈরি করতে হবে। যেমন-আলুর চপ, আলুপুরি, ফ্রায়েড রাইস, চিড়া, মুড়ি, পাস্তা, নুডুলস ইত্যাদি।

* হৃদরোগ

এক্ষেত্রে উচ্চতাপে ডুবা তেলে ভাজা খাবার না দেওয়াই ভালো। এতে ট্রান্সফ্যাট তৈরি হয়ে হৃদরোগের সমস্যা আরও বেড়ে যাবে। মাছ, ফল ও শাকসবজি হৃদরোগীদের জন্য উত্তম। ননীবিহীন দুধ ও টক দই খাওয়া যাবে।

* বয়স্কদের রোজা

তাদের খাবার হবে সহজপাচ্য এবং নরম। দাঁতের সমস্যার জন্য তারা অনেক সময় খাবার চিবিয়ে খেতে পারেন না। এ জন্য বুট ভাজা না দিয়ে ঘুঘনি, চটপটি, হালিম, নরম খিঁচুড়ি, চিড়া-দই-কলা, স্যুপ, দুধ-সুজি, দুধ-পাউরুটি, পায়েস দিলে ভালো হয়। কেউ পছন্দ করলে দুধ-ওটস দেওয়া যায়। দুধ খেতে না চাইলে দই-ছানা দেওয়া যাবে। খেজুরে কোনো সমস্যা নেই। ডিম-মুরগির মাংস অবশ্যই তাদের খাবারে থাকতে হবে।

* কিশোর-কিশোরীদের রোজা

এদের খাবারে যেন পুষ্টির ঘাটতি না হয়, সেদিকে পরিবারের সবার লক্ষ্য রাখতে হবে। তাদের লেখাপড়া ও খেলাধূলার জন্য শক্তি প্রয়োজন। এজন্য রোজা রাখলেও তাদের খাবারে ডিম-দুধ-মাছ-মাংস-ডাল অবশ্যই যেন থাকে। পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা করতে হবে। সন্ধ্যারাতে ভাত খেতে না চাইলে রুটি-লুচি, দুধ-ওটস, ডিম, দিতে হবে। সেহরিতে ভাত-মাছ-মাংস-ডাল-ডিম-দুধ-পাকাকলা সবই থাকতে হবে। খুব কম খাবার খেলে দুর্বলতার জন্য রোজা রাখতে পারবে না।

লেখক : সভাপতি, ডায়াবেটিস নিউট্রিশনিস্ট সোসাইটি অব বাংলাদেশ, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, শ্যামলী ও অ্যাডভান্স হাসপাতাল, ঢাকা।


img

একটানা নয়, দুই দফায় ঘুমানোর পরামর্শ

প্রকাশিত :  ১০:৩৫, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

আমরা সুস্থ থাকার আদর্শ মানদণ্ড হিসেবে টানা আট ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টাকেই ধ্রুব সত্য বলে মেনে নিয়েছি। তবে ইতিহাস ও বিজ্ঞানের গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, আমাদের পূর্বপুরুষদের ঘুমের ধরণ ছিল বর্তমানের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং বৈচিত্র্যময়।

‘বাইফ্যাসিক স্লিপ’ বা দ্বিখণ্ডিত ঘুমের অসংখ্য প্রমাণ মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় সাহিত্য থেকে শুরু করে ভিক্টোরিয়ান যুগের বিভিন্ন নথিতে পাওয়া যায়। ইতিহাসবিদ রজার একির্চ প্রায় ৫০০টিরও বেশি ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, শিল্প বিপ্লবের আগে মানুষ মূলত দুই দফায় ঘুমাতে অভ্যস্ত ছিল। এই প্রাচীন জীবনধারায় মানুষ সূর্যাস্তের পরপরই বিছানায় যেত এবং রাত ১০টা বা ১১টার দিকে তাদের ‘প্রথম ঘুম’ ভেঙে যেত।

প্রথম দফার এই ঘুম ভাঙার পর মানুষের জীবনে ‘ওয়াচিং’ বা জেগে থাকার একটি বিশেষ বিরতি আসত যা প্রায় ঘণ্টা দুয়েক স্থায়ী হতো। এই সময়টুকুতে মানুষ অলস বসে না থেকে ঘরের টুকটাক কাজ, পড়াশোনা, প্রতিবেশী বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গল্পগুজব এবং ধর্মীয় উপাসনা করত। মধ্যরাতের এই বিরতি শেষে তারা পুনরায় ‘দ্বিতীয় ঘুমে’ তলিয়ে যেত এবং সূর্যোদয় পর্যন্ত সেই বিশ্রাম চলত। 

বিজ্ঞানীদের মতে, কৃত্রিম আলোর অনুপস্থিতিতে মানুষের শরীর মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণকে ভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করত বলেই এমনটি হতো। নব্বইয়ের দশকে মনোবিজ্ঞানী টমাস ওয়্যারের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষকে দীর্ঘ সময় অন্ধকারে রাখা হলে তাদের শরীর প্রাকৃতিকভাবেই এই দ্বিখণ্ডিত ঘুমের প্যাটার্নে ফিরে যায়।

এই দুই ঘুমের মধ্যবর্তী সময়ে মানবদেহে ‘প্রোল্যাকটিন’ নামক এক ধরনের হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, যা মানুষকে মানসিকভাবে শান্ত এবং অত্যন্ত সৃজনশীল করে তোলে। আধুনিক যুগের অনেক অনিদ্রা বা ইনসোমনিয়ার রোগী আসলে এই প্রাচীন জৈবিক ঘড়ির প্যাটার্নেই আটকে আছেন, যা বর্তমানের যান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খায় না। 

সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরোপে রাস্তার আলোর প্রচলন এবং পরবর্তীকালে শিল্প বিপ্লবের ফলে কৃত্রিম আলোর বিস্তার মানুষের এই আদিম অভ্যাসকে বদলে দেয়। কফি পানের সংস্কৃতি এবং রাত জেগে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা ঘুমের সেই মধ্যবর্তী সৃজনশীল বিরতিটুকুকে চিরতরে হারিয়ে দেয়।

আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, আট ঘণ্টার টানা ঘুমের প্রথা আসলে একটি সমকালীন উদ্ভাবন যা অনেক সময় আমাদের ডিএনএ-তে থাকা আদিম অভ্যাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়। বিশেষ করে ছাত্র, গবেষক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বা সৃজনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য এই মধ্যবর্তী জেগে থাকার সময় বা ‘ওয়াচ’ অত্যন্ত ফলপ্রসূ হতে পারে। 

ইতিহাসের এই বাঁক আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিশ্রামের কোনো ধরাবাঁধা গাণিতিক নিয়ম নেই। বরং প্রকৃতির ছন্দের সঙ্গে শরীরকে মিলিয়ে নেওয়াই ছিল মানুষের প্রকৃত স্বভাব। এই আদিম জৈবিকতাকে যদি বর্তমানের সৃজনশীল কাজে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে তা আমাদের চিন্তাশক্তিকে আরও শাণিত করতে পারে।